শুকতারা | ভয়ের দেশ | মুকুলিকা দাস | Bengali Horror Story
আনুমানিক সময়:56 মিনিট, 45 সেকেন্ড

শুকতারা | ভয়ের দেশ | মুকুলিকা দাস | Bengali Horror Story
0 (0)

Getting your Trinity Audio player ready...

জলের কোনো গন্ধ নেই, বর্ণ নই, অথচ বৃষ্টি এলেই বিপাশা একটা গন্ধ পায়। এই গন্ধ বহু পরিচিত, কেমন স্যাঁতসেঁতে গন্ধ! সেটা অবশ্য চুনকামবিহীন শ্যাওলা পড়া পাঁচিল থেকে আসে নাকি মনের অন্তঃস্থল থেকে উঠে আসে, তা সে বুঝতে পারে না।

দরজা জানালা খুলে দিতে ইচ্ছে করে খুব! কিন্তু খুললেই নির্জনতা আরো গ্রাস করে যেন। এই এতো বড়ো বাড়িতে সে যে একা, তা সে জানে। কিন্তু বাইরের জগতের দ্বার খুললেই তার মনে হতে থাকে, সমস্ত জগতটা একপাশে আর সে আরেক পাশে। মনে হয়, এতো বড়ো পৃথিবীতেও সে বড়ো একা, সে যেন এক ঘুমন্তপুরীতে বন্দি, সবাই ঘুমোচ্ছে দিবারাত্রি- অথচ তার চোখে ঘুম নেই। কতরাত সে ঘুমোতে চায়, বালিশে মাথা রেখে উলটো গুনতি গোনে, ছোটবেলায় ঠাকুমার ভাঙা গলায় গাওয়া ঘুমপাড়ানি গান গুনগুন করে, বন্ধ চোখে জোর করে ছোটবেলার আনন্দের দিনগুলো ভাবতে থাকে, আর সেসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে অনেকটা বাঁধ ভাঙার আগে মাটিতে যেমন কাঁপন ধরায় প্লাবন, ঠিক তেমন! এই জিনিসটাতেই তো ভয়, একবার অশ্রুধারায় সিক্ত হলে আর থামবার জো নেই! এ যেন শ্রাবণের ধারা, থামতেই চায় না! ঝরেই চলে অবিরত…

এভাবেই বিনিদ্র রাতগুলো কাটে বিপাশার। চোখের তলায় কালি পড়তে থাকে, অগোছালো চুলে বাড়তে থাকে জটা, আলুথালু শাড়ি গুছিয়ে পরতে ইচ্ছে হয় না, বড়ো কপালে টিপও নেই। শুধু ফ্যাকাশে সিঁথিতে সিঁদুর খুব বেশি জ্বলজ্বল করে। যতোটা বিপাশার প্রাণশক্তি নিহিত আছে, তাও যেন রক্তচোষার শুষে নিচ্ছে সিঁদুরটুকুন! হাতের শাখা-পলাও মাঝে মাঝে ভারী ঠেকে বড্ড, ইচ্ছে হয় সেসব ভেঙে-চুড়ে বেড়িয়ে আসতে, কিন্তু…

কলিংবেলের আওয়াজে চমকে ওঠে বিপাশা!

কে এলো? এই ভরদুপুরে, তাও এমন বৃষ্টি-বাদলার দিনে? বিপাশার স্বামী তো আসে সেই রাত্তিরে, আর তো কেউ আসে না ওর খোঁজ নিতে?

চমকে ওঠে বিপাশা!

দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে বিপাশা-

– কে?

– আমি, আমি অপূর্ব!

– কে অপূর্ব?

– বিপু, চিনতে পারছিস না? আমি অপু রে, কোচবিহার থেকে!

বুকের ভেতরটা আবার মোচড় দেয়। অপু কেন আসবে? অপুকে তো সে ফেলেই এসেছে পাঁচ বছর আগে। আজ হঠাৎ সে…

দরজা খুলে ফেলে বিপাশা! কতদিন পর বৃষ্টির ছাঁট জল তার ঘরে ঢুকে পড়ে।

– ভেতরে এসো!

ভেজা ছাতাটা হাতে নিয়ে অপূর্ব এদিক ওদিক তাকায়, বিপাশা হাত থেকে ছাতাটা নিয়ে মেলে দেয় সামনের প্যাসেজটায়।

অপূর্বর ভেজা চুল দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। চশমার ভেজা কাঁচ দিয়ে ভালো দেখতে পারছে না সে বিপাশাকে, তবুও এতো বছর পর বিপাশাকে এতোটা কাছে পেয়ে চশমা খুলতেও ভুলে যায় সে।

বিপাশা ওকে নিয়ে বসায় ড্রয়িংরুমে।

– ইশ, পুরো ভিজে গিয়েছো তো, শার্টটা না হয় খুলে বোসো, আমি শুকোতে দিই।

– না না, থাক না।

– কিসের থাক না, তোমার যে ঠান্ডার ধাত, সে বুঝি আমার জানা নেই। বুকে কফ জমে যাবে। দাও না অপুদা!

একই আছে যেন বিপু, একটুও বদলায়নি। কিন্তু অধিকারবোধ থাকলেই কি হয়, অধিকারটাই তো নেই!

ভেজা শার্টটা নিয়ে বিপাশা নিজের ঘরে চলে যায়, বারান্দায় শুকোতে দিয়ে লাভ কি, আবার ভিজবে। ঘরে টানা দড়ি বাঁধা, সেখানেই বাকি কাপড় মেলা থাকে।

শার্টটা দড়িতে মেলতে মেলতে হঠাৎ নাকের কাছে এনে কি একটা খোঁজে বিপাশা, পুরোনো একটা গন্ধ! সেই যে তার অপু-দা আসতো কলেজ পালিয়ে তার স্কুলের সামনে! ওর স্কুটারে করে বেড়িয়ে পড়তো বিপাশা সাগরদীঘিতে যাওয়ার জন্য। অপু-দাকে লেপ্টে বসতো ও আর তখনই আসতো একটা গন্ধ! সব মানুষেরই গায়ে একটা আলাদা গন্ধ থাকে। অপু-দারও ছিলো, গন্ধটা যেন সবকিছু মেশানো- ভালোবাসা, ভরসার, আশ্রয়ের, আদরের…

বিপাশা শার্টটা জড়িয়ে ধরে। গন্ধটা পাল্টায়নি, হয়তো মানুষটাও তাই!

* * *

অপূর্ব কেমন বোকার মতোন বসে আছে! ও জানে না, হঠাৎ করে কোলকাতা আসার মানে কি ছিলো? পাঁচ বছরে তো আসেনি, তবে আজ কেন? একটা স্বপ্নই ওকে এতোদূর টেনে নিয়ে এলো? আচ্ছা, বিপু যদি জিজ্ঞেস করে কেন এলে, কি বলবে? কারণটা শুনে ও নিশ্চয় হাসবে? ভাববে ওর অপু-দা এখনো বোকা।

– আদা চা করে নিয়ে এলাম। গা-টা গরম হবে। এই শার্টটা পরে নাও। নতুন একদম।

– না না, এসব কেন?

– উফ, এটা আমার ঘর। আমার কথাই চলবে।

– এখনো জেদি আছিস।

অপূর্ব শার্টটা পরছে, ওর পিঠের দিকের জরুলটা দেখে অনেক কিছু মনে পড়ে বিপাশার, চোখ নামিয়ে নেয়।

– খুব রোগা হয়ে গেছো অপু-দা। খাওয়া দাওয়া করো না? চুলও তো পড়তে শুরু করেছে!

– ওই আর কি! বয়স তো হচ্ছে।

– কতোই বা, সবে ত্রিশ, তাতেই?

– তুইও তো রোগা হয়েছিস, আর কেমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে, যেন রক্ত নেই!

– সে তো আমার হিমোগ্লোবিন কম বরাবরই, তাই হয়তো!

– ভালো আছিস বিপু?

– একই প্রশ্ন যদি আমি করি অপু-দা?

দু’জনেই চুপ হয়ে যায়। আসলে প্রশ্নটাই অবান্তর!

– এতোদিন হয়ে গেলো, একবার বাড়িতে তো আসতে পারতিস?

– বাড়ি! হ্যাঁ, যাওয়া তো হয় না।

– সবাই তোর কথা বলে। পাড়ার সবচেয়ে ছটফটে মেয়েটা কি শ্বশুরবাড়ি গিয়ে এতো শান্ত হয়ে গেলো?

– তাই, এসব বলে বুঝি?

– হুম, বলে তো।

– তোমার চশমাটা দাও তো, ঝাপসা হয়ে আছে তো পুরো।

বলে বিপাশা নিজেই চশমাটা খুলে নেয় অপূর্বর চোখ থেকে। অপূর্ব আরো একবার চমকে ওঠে। বিপু তার একই আছে।

– একটুও পাল্টাওনি, কবে থেকে মোছো না চশমাটা?

শাড়ির আঁচলে মুছতে মুছতে বলে চলে বিপাশা!

– কে মুছে দেবে বল, আগে তাও তুই দিতিস।

– কেন? ঘরে কেউ নেই?

– মা মাঝে মাঝে দেয়, চোখে পড়লে।

– তুমি বিয়ে করোনি!

চশমাটা বিপাশার হাত থেকে নিয়ে পরে নেয় অপূর্ব! এখন বড্ড পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে সবটা, বিপাশাকেও…

– কি গো, জিজ্ঞেস করলাম কিছু।

– না, করিনি।

– কেন?

– কারণটা জানিস না?

– তুমি কি আজীবন বোকাই থাকবে?

অনেকটা রেগে কথাটা বলে বিপাশা। উঠে যায় সোফা থেকে। সামনের বড়ো জানলা ঘেঁষে দাঁড়ায়। কাঁচটা চুয়ে চুয়ে জল গড়িয়েই যাচ্ছে। বৃষ্টি থামবে না!

অপূর্বও উঠে বিপাশার পেছনে দাঁড়ায়।

– তোকে যে ভুলতে পারবো না, আবার অন্য কাউকে যে তোর জায়গা দেবো সেটাও সম্ভব না। অভিনয় করে চলা সম্ভব না রে!

– বাহ, যার জন্য এতো কিছু করছো, সে তো দিব্যি গুছিয়ে সংসার করছে। সে যদি স্বার্থপর হতে পারে তবে তুমি নও কেন?

মুখ ঘুরিয়ে কথাগুলো বলে চলেছে বিপাশা। অপূর্বর চোখ আটকে আছে বিপাশার পিঠে। আলুথালু হয়ে আসা শাড়িতে বিপাশার পিঠ অনেকটা অনাবৃত, আর সেখানে কিছু কালশিটে দাগ! মূহুর্তে ভ্রু কুঁচকে ওঠে ওর!

– বিপু, আমার দিকে ঘোর তো!

বলে অনেকটা জোর করেই বিপাশার মুখটা নিজের নজরের কাছে নিয়ে আসে অপূর্ব! খুলে দেয় বন্ধ জানলা। বৃষ্টির শব্দটা অনেকটাই জোরে শোনা যাচ্ছে। বিপাশার মুখের সামনের চুলগুলো সরিয়ে ভালো করে দেখে অপূর্ব। বিপাশা ছাড়ানোর চেষ্টা করছে নিজেকে অপূর্বর হাত থেকে, মুখটা কিছুতেই দেখাতে চাইছে না।

কেন দেখাবে? দেখালেই যে ধরা পড়ে যাবে তার আদরের বিপুর কপালে গভীর এক কাটা দাগ। নীচের ঠোঁটটা একপাশে ফুলে আছে, গালের একদিকে কালো হয়ে রয়েছে, জোরে কিছু দিয়ে আঘাত করলে এরকম দাগ হয়ে যায়।

– এসব কি বিপু?

নিজেকে এতোক্ষণে ছাড়িয়ে নিয়ে বিপাশা আবার বসে পড়ে সোফায়। হাঁপাচ্ছে ও!

– আমি কিছু জিজ্ঞেস করছি বিপু? তুই সত্যি ভালো আছিস তো?

– তার আগে তুমি বলো কেন এসেছো?

ঝাঁঝালো গলায় বলে ওঠে বিপাশা।

– কেন আসতে পারি না?

– পারো, খুব পারো, কিন্তু আজ কেন?

– সত্যিটা বোকা বোকা, একটা স্বপ্ন দেখে এলাম।

– মানে?

– বাজে একটা স্বপ্ন, ওটা দেখলাম পরশু রাতে। আর স্থির হয়ে থাকতে পারছিলাম না রে, তাই…

জোরে জোরে হেসে ওঠে বিপাশা। তার হাসির আওয়াজ প্রায় বদ্ধ ঘরটায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বারবার। বড্ড অস্বাভাবিক সেই হাসিটা, অপূর্বর ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে ওঠে!

– এরকম করছিস কেন বিপু? কি হয়েছে বল? তোর বর কি তোকে মারধোর করে? অত্যাচার করে তোর ওপর? তোর শরীরে তো এসব মারেরই দাগ। আমাকে বল, আমি ব্যবস্থা করবো।

হাসি থামিয়ে, আর্দ্র চোখটা মুছে নেয় বিপাশা।

– কি করবে তুমি? আমি যদি সত্যিটা বলিও কি করবে?

– তোকে নিয়ে চলে যাবো। নরকে থাকতে দেবো না।

– হা হা হা, তাই? আজ বুঝি এতো সাহস হলো অপু-দা। বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছে যে।

* * *

বিপাশার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে অপূর্ব। বিপাশার কোলের কাছে জড়ো করা হাত দু’টো চেপে ধরে শক্ত করে, তারপর বলে-

– বিপু, সেদিন সাহস ছিলো না, কারণ তোর অপু-দা তখন পঁচিশ বছরের বেকার যুবক। তোকে ঘরে তুলে খাওয়াতাম কি? তোর খরচ চালানোর মতোন আয় টিউশন পড়িয়ে আসতো না আমার। কি নিয়ে তোর বাবা-মায়ের সামনে দাঁড়াতাম বল!

– কিন্তু আমি তো তোমার সাথেই থাকতে চেয়েছিলাম অপু-দা। যেমনই আয় হোক তোমার, ঠিক গুছিয়ে নিতাম। অর্থ নিয়ে এতো ভাবনা ছিলো তোমার? আমাকে দেখো, এই এতো বড়ো বাড়িটা, এতো আসবাবপত্র, এতো এতো শখ-আহ্লাদের ঘনঘটা- সব থেকেও যেন কিছু নেই! আমার দু’টো কথা বলার মানুষ নেই জানো, কান্না পেলে কারো বুকে মাথা রেখে কাঁদবো তার সুযোগ টুকুন নেই, কারো কাছে নিজের স্বপ্নের কথা বলবো সেই মানুষটাই নেই। এই এতো এতো জিনিসের মাঝে থাকতে থাকতে নিজেকে এক জড়পদার্থ ছাড়া কিচ্ছু মনে হয় না। আমি এই জীবন চাইনি বিশ্বাস করো, আমি একটু সুখ খুঁজেছিলাম, কাছের মানুষ খুঁজেছিলাম, আমি…আমি…আমি ভালো নেই অপু-দা, আমি ভালো নেই।

কান্নায় ভেঙে পড়ে বিপাশা।

বেলা গড়িয়েছে অনেকটাই। অপূর্বর জন্য আনা চা-য়ে একটা মাছি ভেসে বেড়াচ্ছে।

বিপাশা অনেকক্ষণ ধরে অপূর্বর কাঁধে মুখ গুঁজে কেঁদে চলেছে। অপূর্ব আটকায়নি। শুধু পকেট থেকে রুমালটা বার করে মাঝে মাঝে চশমায় ঢেকে থাকা চোখটা মুছে নিচ্ছে।

বিপাশা, এবার নিজেকে সামলে নেয়। তারপর সোফায় সোজা হয়ে বসে। একটু শান্ত হয়ে বলতে থাকে-

– অপু দা, বাড়ির সবাই ভালো আছে?

– হুম, আছে। তোর বাবার বুকের ব্যাথাটা বেড়েছিলো মাঝখানে, আমি শিলিগুড়িতে ভালো ডাক্তার দেখিয়েছি। মা ভালো আছে। তুই কিন্তু বিপু বারবার আমার প্রশ্নের উত্তরটা এড়িয়ে যাচ্ছিস। তোর বর তোকে মারধোর করে?

– যাক, তুমি যখন বাড়ির দিকে খেয়াল রাখছো, আমি নিশ্চিত হলাম। দায়িত্ব তুমি বরাবর ভালো নাও। আমার এখনো মনে আছে, আমি তখন ক্লাস টেনে ষোলো বছর বয়স, সাইকেল নিয়ে পড়ে গিয়েছিলাম স্কুলে, পা ভেঙে দু’মাস ঘরে আটকে, কি যত্ন নিয়েছিলে আমার! উনিশ বছরের সেই অপু-দাকে দেখে প্রথমবার আর দাদা মনে হয়নি, মনে হয়েছিলো যে মহাদেবের আরাধনা করে এসেছি শিব চতুর্দশীতে, তুমি বুঝি স্বয়ং তাই। ইচ্ছে ছিলো তোমার পার্বতী হয়ে রইবো আজীবন!

– বিপু…চুপ কর। এসব শুনলে আমার কষ্ট হয়।

– বলতে দাও অপু দা, না বলতে পারলে যে আমার স্বস্তি নেই। আর হয়তো কোনোদিন বলাও হবে না!

– কেন, কেন বলা হবে না? তোকে আমি এখান থেকে নিয়ে যাবো বিপু, আমি বুঝতে পারছি, এখানে তোর খুব কষ্ট, বড়ো কষ্ট!

– পারবে না অপু দা, পারবে না। এই যক্ষপুরী থেকে আমার মুক্তি নেই। তুমি ফিরে যাও অপু দা, আমার ভেতরকার হাহাকার ঠেলে বেড়িয়ে আসছে ক্রমশ আমি আর নিজেকে সামলাতে পারছি না। জড় পদার্থের মতন বুকে পাথর চাপা দিয়ে ঘুরে মরেছি, তোমায় দেখে সেই মিথ্যে পাথরটা হঠাৎ হিমবাহের মতোন গলতে শুরু করেছে যেন। এরপর তোমায় আঁকড়ে বাঁচার লোভটা আবার ফিরে আসবে গো, আমি আমি আমি পারবো না নিজেকে সামলাতে।

বিপাশা চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। অপূর্ব বিপাশাকে জাপটে ধরে, ওর বুকের মাঝে অশান্ত বিপাশা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে।

– বিপু, তোর এই অবস্থার জন্য আমি দায়ী। আমিই তোকে নরকের দিকে ঠেলে দিয়েছি। আমিই তোকে উদ্ধার করবো। তোর স্বামীকে আমিই উচিৎ শাস্তি দেবো।

হঠাৎ হা হা হা করে হেসে ওঠে বিপাশা। সেই হাসি বড়ো অস্বাভাবিক!

– তুমি শাস্তি দেবে? কি করবে শুনি? ওই লোকের ক্ষমতা জানো? বড়ো বিজনেসম্যান, প্রচুর টাকাপয়সা দেখে বিয়ে দিয়েছিলো না আমার বাবা-মা! কিন্তু একবারও জানার চেষ্টা করলো না তার স্বভাব, চরিত্র, নীতিবোধ কেমন? তুমি জানো, প্রতি রাতে নতুন নতুন মেয়েছেলে নিয়ে নিজের বেডরুমে ঢোকে ও, আর আমি আমার বিছানা আঁকড়ে কোনোমতে অন্ধকার কাটানোর চেষ্টা করি। রাতে ডিনারের সময় রান্না অল্প মন-মতোন না হলেই মুখের ওপর ছুঁড়ে দেয় গরম খাবার। কথায় কথায় আমার বাড়ি, বাবা-মা নিয়ে অপমান করে, তার জবাবে কিছু বললেই শুরু হয় চড়-থাপ্পড়! পরশু দিন জানো অপুদা, আমার ভীষণ জ্বর ছিলো সকাল থেকে, তাও কোনোমতে ব্রেকফাস্ট করে দিলাম। তারপর থেকে বিছানা আঁকড়ে পড়ে ছিলাম, রাত বাড়তে বাড়তে জ্বর কমলো, ওই শয়তানটা এলো ঘরে। পুরো শরীর দিয়ে মদের গন্ধ, কাছে যেতেই গুলিয়ে উঠলো শরীরটা। কিন্তু, কিন্তু আমি বুঝিনি…ওই শয়তানটা আমাকে জাপটে ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেলো বিছানায়। আমি কাকতি মিনতি করলাম বারবার, ছেড়ে দাও, আমার শরীর আজ ভীষণ খারাপ, আমি…আমি পারবো না কিন্তু উনি শুনলেন না। ঝাপিয়ে পড়লো ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতোন। ওনার ইচ্ছেমতো না চললেই এলোপাতাড়ি চালিয়ে দিচ্ছিলো ঘুষি-কিল-চড়…আমি ধীরে ধীরে নিথর লাশের মতোন নিস্তেজ হতে থাকলাম। জানো অপুদা, চোখটা বুজতে বুজতে আমার না হঠাৎ মায়ের কথা মনে পড়ছিলো, বাবার চেহারাটা ভেসে উঠছিলো চোখের সামনে, আর আর তোমাকে…তোমাকে বড়ো মনে পড়ছিলো…দেখছিলাম তুমিও ছটফট করছো, কাঁদছো। আমার একটা ফটো আঁকড়ে ধরে বিছানায় কুঁকড়ে শুয়ে আছো। অপুদা, তুমি কি সত্যিই আমাকে অমন করেই মনে করো, অমন করেই…

অপূর্ব আর নিজেকে সামলাতে পারে না, বিপাশার গালে ঠোঁটে চুমু খেতে থাকে বারবার। তারপর হাউহাউ করে কেঁদে ওঠে, নিজের হাতে চোখ-মুখ ঢেকে নেয়। পুরো শরীর কাঁপছে অপূর্বর কাঁদতে কাঁদতে। অপূর্বকে এভাবে কোনোদিন কাঁদতে দেখেনি বিপাশা। মাধ্যমিকে ২ নম্বরের জন্য একশো পায়নি অপূর্ব, সেদিনও ওর চোখে এমন মেঘ জমতে দেখেনি, যেদিন অপূর্বর মা মারা যায় সেদিনও অপূর্ব এভাবে ভেঙে পড়েনি, বিপাশার যেদিন বিয়ে হয়, কনে-বিদায় হয় সেদিন অপূর্ব নিজের চোখের জল লুকিয়েছিলো ঠিকই কিন্তু আজ এভাবে ভেঙে পড়তে দেখে অবাক হয় বিপাশা।

অপূর্ব নিজের চোখ মুছে নিয়ে বিপাশার হাত নিজের মুঠোর মধ্যে ধরে জিজ্ঞেস করে,

– বিপু, তুই কি আমায় ক্ষমা করেছিস?

– যাকে ভালোবাসা যায়, তার ওপর শুধু অভিমান থাকে অপু-দা, রাগ নয়!

* * *

বৃষ্টি থেমে গিয়েছে। দিনের আলো কমে এসেছে। অপূর্বর বুকে মাথা রেখে ভেজা ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে বিপাশা।

অনেকদিন বাদে ছাদে এলো বিপাশা। আগে মাঝে মাঝেই আসতো কিন্তু, যখন খুব কান্না পেতো। কিন্তু এখন আর কান্নাও পায় না, আর আসেও না। ভেতরকার আবেগী নদী যেন শুকিয়ে যাচ্ছে।

আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা দেখছে ওরা। ছোটবেলায় দু’জন মিলে উঠোনে শুয়ে তারা দেখতো ওরা। একে একে চিনেছিলো সপ্তর্ষিমণ্ডল, কালপুরুষ। আর সবচেয়ে বেশি চিনেছিলো শুকতারা।

– অপু দা, মানুষ মরে গেলে যে তারা হয়ে যায় তা বিশ্বাস করো?

– এ যে মিথ্যে তা জানি বিপু, কিন্তু এই মিথ্যে নিয়েই আমি পাঁচটা বছর কাটিয়েছি। শুকতারার সাথে কথা বলেছি যেন সে তোর খেয়াল রাখে। তোর সাথে যোগাযোগের সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেই ছিলো আমার কথা বলার সঙ্গী।

– আমিও বিপু দা, ওই তারাদের দিকে তাকিয়েই আমার হারিয়ে যাওয়া বিপুর কথা মনে পড়ে। মনে হয়, ওটাই আমার ঘর। আমাদের মেয়েদের তো কোনো ঘর থাকে না অপু-দা। বাপের বাড়িও আমাদের না, শ্বশুরবাড়িও না। বাইরে হোক বা অন্দরে মেয়েদের সত্যি কোনো ঘর থাকে না!

অপু চুপ থাকে। বলুক মেয়েটা, আজ ওর পাঁচ বছরের জমানো কষ্টগুলো বেড়িয়ে আসুক খোলস ছেড়ে।

হঠাৎ এক গাড়ির হর্ণের আওয়াজে সম্বিত ফেরে বিপাশার। এ আওয়াজ ওর চেনা, অনিমেষ ফিরেছে। প্রচণ্ড ঘাবড়ে যায় ও।

– অপু দা, তুমি শীগগির বেড়িয়ে যাও এখান থেকে। ও তোমাকে দেখলে আর আস্ত রাখবে না। সাক্ষাৎ শয়তান ও।

– তুই ভয় পাচ্ছিস কেন? আমি তোর বাড়ির লোক, কি করবে ও আমাকে?

– না তুমি ওকে জানো না, একবার সন্দেহ করলে তোমাকে শেষ করে দেবে। ছাদের পেছন দিকটায় সরু সিঁড়িমতোন আছে সেদিক দিয়ে বেড়িয়ে যাও, আর কক্ষনো এসো না।

– না বিপু, আমি তোকে এখান থেকে নিয়েই যাবো। সারাজীবন অনেক ভয় পেয়েছি, আর না!

এই বলে সে বিপাশার হাত ধরে নীচের দিকে এগোতে থাকে।

* * *

অনিমেষ ঘরে ঢুকেই টলতে থাকে। আজ মদ বেশি খায়নি, তবুও টলছে যেন বেশিই। পরশুদিনে ঘটে যাওয়া ঘটনাটার পর থেকে আরো দুর্বল হয়ে গেছে যেন। ঠিক দুর্বল না, তবে একটা চোরা ভয় আর উত্তেজনা সবসময় কাজ করছে ওর ভেতরে। নিজের ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছে ওর। অন্যদিন হলে বিপাশার ওপর ঝালটা মিটিয়ে নেওয়া যেতো, কিন্তু এখন তো সেটাও সম্ভব না।

অভ্যাসবশত সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে টলতে টলতে ঘরে ঢোকে অনিমেষ। কিন্তু সেই পচা গন্ধটা। আবার গা গুলিয়ে ওঠে অনিমেষের। এই গন্ধটা সহ্য হচ্ছে না কাল থেকে। তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে সে, নীচে নেমে বাথরুমে ঢোকে। অনেকটা বমি করে। তারপর সোফায় গা এলিয়ে দেয়।

* * *

বিপাশাকে সাথে নিয়ে অপূর্ব ঢোকে সোজা সেই ঘরটায়। বিছানার ওপর ফেলে রাখা ব্রিফকেসটা জানান দেয় যে অনিমেষ ঘরেই আছে। অপূর্ব বারান্দায় খুঁজে তাকে না পেয়ে বাথরুমে টোকা দেয়, বাথরুমের দরজাটা ফাঁক করাই ছিলো, দরজাটা পুরো খুলতেই ছিটকে যায় অপূর্ব!

বাথটবে পড়ে আছে বিপাশার লাশ! মুখটা হাঁ করে খোলা, চোখগুলো ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন কিছু খুঁজছে। পুরো শরীরে মারের চিহ্ন, গালের একপাশ কালো হয়ে আছে আর কপালের একদিকে গভীর কাটা দাগ। সেদিক দিয়ে চুইয়েছে রক্ত। মেঝেতে তা জমে কালচে হয়ে আছে!

– বিপু…তুই…

বিপাশার একটা ম্লান হাসি হেসে মেঝেতে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে। হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে। হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে এসে অপূর্ব জড়িয়ে ধরে বিপাশাকে। বিপাশা যদি দেখতে পেতো, তাহলে অপূর্বর চোখে গভীর ক্রোধের আগুন দেখে চমকে যেতো।

* * *

হঠাৎই ঘুম ভেঙে যায় অনিমেষের। পুরো ঘরটায় কেমন দমবন্ধ করা পরিবেশ। এতো অন্ধকারই বা কেন সেটাও বুঝতে পারে না। লোডশেডিং হলেও তো জেনারেটরের কাজ করা উচিৎ!

হঠাৎ সেই পচা গন্ধটা এখানেও পেতে শুরু করে অনিমেষ। হঠাৎই সামনে তাকিয়ে অসম্ভব ভয় পেয়ে চিৎকার করে ওঠে সে। অস্ফুটে বলে ওঠে-

– বি…বি…বিপাশা!

ঘরটা অন্ধকার হলেও বিপাশার চারপাশে এক নীলচে আভা যেন বলয়ের মতন ঘিরে আছে। বিপাশার চোখে-মুখে অসম্ভব ক্রূঢ়তা। অনিমেষের ইচ্ছে হচ্ছে উঠে পালিয়ে যাবে কিন্তু কেউ যেন তার পা বেঁধে রেখেছে মেঝের সাথে। চাইলেও উঠতে পারছে না ও।

হঠাৎ ঘরে সেই পচা গন্ধ ছাপিয়ে পেট্রোলের গন্ধ ভরে যেতে থাকে। অনিমেষের চোখ আরো বিস্ফারিত হয়ে ওঠে। ও বুঝতে পারে কি হতে চলেছে। আরো একবার দৌড়ে বেরোতে যায় সে, কিন্তু পারে না। মেঝের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়, সেখান থেকেই হাতজোড় করে মিনতি করতে থাকে সে

– বিপাশা, আমার ভুল হয়ে গিয়েছে, আমাকে ক্ষমা করে দাও, আমাকে…আমি বাঁচতে চাই।

– আমিও বাঁচতে চেয়েছিলাম অনিমেষ। আমিও বাঁচতে চেয়েছিলাম।

এরপর একটা খস করে আওয়াজ হয়। বিপাশার হাতে জ্বলে ওঠে একটা দেশলাই কাঠি।

ধীরে ধীরে সেই আগুন ছড়িয়ে পড়তে থাকে পুরো বাড়িতে। অপূর্বর জীবনের এতোদিনের সব না পাওয়ার হিসেবগুলো যেন আগুনের আঁচে মিলে যাচ্ছে আপনা থেকেই। বিপাশার ঠোঁট আরো একবার ছুঁয়ে যায় ও। তারপর খুব শক্ত করে জড়িয়ে থাকে।

বাইরে বেশ কোলাহল চলছে। ফায়ার বিগ্রেডের চারটে গাড়িও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। তারা দরজা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছে।

আগুন ছুঁয়ে যাচ্ছে ওদেরও। অপূর্বর বুকে চোখ বুজে থাকতে থাকতে বিপাশা জিজ্ঞেস করে-

– এরপর কি হবে অপু-দা?

– আমরা তারা হবো এবার। তুই আর আমি শুকতারার পাশে সুখে থাকবো। তারাদের দেশে কোনো কষ্ট থাকে না বিপু!

* * *

পরদিন সকালে নিউজপেপারে দু’টো খবর বড়ো বড়ো করে ছাপে।

প্রথম খবর, বীভৎস অগ্নিকান্ডে মৃত্যু হয়েছে বিখ্যাত ব্যবসায়ী অনিমেষ বসু ও তার স্ত্রীর।

আর দ্বিতীয়, প্রবল বর্ষণের কারণে গতকাল ভোরে আলিপুরদুয়ার থেকে শিয়ালদহগামী ট্রেন দুর্ঘটনায় মৃত ৭৬ জন যাত্রী। মৃতের তালিকায় ছিলো, অপূর্ব রায়, বয়স ৩০।

About Post Author

9F10 AB

Click to rate this post!
[Total: 0 Average: 0]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Previous post বসুভবনের বিভীষিকা | ভয়ের দেশ | আয়ুষ চরিত| Bengali Horror Story
সাধুবাবা রহস্য | ভয়ের দেশ | অঙ্কিত ভট্টাচার্য| Bengali Horror Story Next post সাধুবাবা রহস্য | ভয়ের দেশ | অঙ্কিত ভট্টাচার্য| Bengali Horror Story