|
Getting your Trinity Audio player ready...
|
আজ শনিবার, প্রতি সপ্তাহের মতো আজও স্কুল ছুটির পর রওনা দিলাম পাড়ার ক্লাবের উদ্দেশ্যে। সেখানে এসে হাজির হবে আমাদের গ্রামের একমাত্র হাইস্কুলের কিছু ছেলেপুলে আর আমার আরও দুই ছাত্র। ছেলেগুলো ওই নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়ে। আমার অন্য দু’টি ছাত্র মানে সুদীপ আর অরিত্র এখন কলেজে পড়ছে, সুদীপ ফিজিক্স আর অরিত্র কেমিস্ট্রি নিয়ে। ওরাও আমার পাড়াতেই থাকে। আর আমি হলাম প্রদীপ্ত মুখার্জি, সেই স্কুলেরই পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক। সৌভাগ্যক্রমে এই গ্রামেই ছোটো থেকে বড়ো হয়ে ওঠা এবং এই স্কুল থেকেই মাধ্যমিক পাস করি। তাই এই গ্রামের প্রতি, গ্রামের মানুষগুলোর প্রতি এবং অবশ্যই এই স্কুলটার প্রতি আমার এক অদ্ভুত মায়া, টান অনুভব করি সবসময়ই। যাই হোক, যে কথা বলছিলাম, আসলে পাড়ার ক্লাবে যাওয়ার উদ্দেশ্য কিন্তু আড্ডা দেওয়া বা খেলাধুলা না। আমরা কয়েকজন মিলে একটা ছোট্ট দল গড়েছি যাদের উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানের প্রচার ও কুসংস্কার দূরে ঠেলে বৈজ্ঞানিক মানসিকতার প্রসার ঘটানো। যদিও এখনও পর্যন্ত সেরকম বড়োসড়ো কিছু করে উঠতে পারিনি, তবুও আগের বছর ছোটো করে একটা বিজ্ঞানের প্রদর্শনী ও সাইন্টিফিক মডেল কম্পিটিশনের আয়োজন করেছিলাম আমাদের স্কুলেতে এবং সেটা করাতে গ্রামে আমাদের বিজ্ঞান ক্লাবের ব্যাপারটা বেশ ছড়িয়ে পড়ে। তারপর আরও কিছু ছোটোখাটো উদ্যোগ আমরা সারা বছর ধরেই নিচ্ছি বিজ্ঞান চেতনাকে বাড়িয়ে তোলার উদ্দেশ্য, যেমন পাড়ায়-পাড়ায় গিয়ে মহিলাদের ডেকে বিশেষ কিছু কুসংস্কার নিয়ে কথা বলা, পড়াশোনা না করা বাচ্চাদের ডেকে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বোঝানো ইত্যাদি।
আজ স্কুলে গিয়ে এমন একটা খবর পেলাম, যেটার জন্য হয়তো আমাদের বিজ্ঞান ক্লাব প্রথম দিন থেকেই অপেক্ষা করছিল। আর সেই বিষয় নিয়েই আজ জরুরী আলোচনা করার আছে আমার ক্লাবের ছোট ছোট সদস্যদের সাথে। পাড়ার ক্লাবের ছোট ঘরটায় গিয়ে দেখলাম সকলেই এসে গেছে। সবার উদ্দেশ্যে আমি বললাম “সকলে মন দিয়ে শোন, আমাদের সামনে একটা চ্যালেঞ্জ এসেছে এতো দিনে। আর সেটা যদি আমরা সঠিক ভাবে উতরে যেতে পারি, তাহলে আমাদের এতোদিনের সকল প্রচেষ্টা সার্থক হবে। তোরা হয়তো অনেকে শুনে থাকবি যে আমাদের পাশের গ্রামে নাকি এক সাধুবাবা হঠাৎ উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন এই দিন পনেরো হল। আর এই দুই সপ্তাহের মধ্যেই তাঁর পসার নাকি দারুণ জমে উঠেছে। আশপাশের গ্রামের লোকেরাও তাঁর জাদু দেখতে আসছে নাকি। তাই বুঝতেই পারছিস তোরা যে আমাদের এখন কি করণীয়। সাধুবাবাকে প্রথমে ভালো করে কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করা এবং তাঁর সেই ভণ্ডামির আসল রূপ সকলের সামনে তুলে ধরা। তাই আমি ঠিক করেছি যে কাল সুদীপ, অরিত্র আর আমি, এই তিন জনে মিলে যাব সেই সাধু বাবার ডেরায়। আমি ঠিকানা জোগাড় করে নিচ্ছি। শুনেছি তিনি নাকি তাঁর কোন বড়লোক ভক্তের বাড়ীতে আপাতত উঠেছেন। আগামীকাল আগে আমরা দেখে শুনে আসি, তারপর তোদের সকলের কি করণীয়, সেটা ভেবে প্ল্যান করা যাবে, কেমন? আজ আমি বেরোচ্ছি, একটু তাড়া আছে। তোরা যে প্রোজেক্টটা বানাচ্ছিলি সেটার কাজ কর, আমি পরের শনিবার দেখবো।” এই বলে আমি বাড়ির পথে হাঁটা লাগালাম। বাড়ি এসে মায়ের কাছে আরও কিছু খবর জানতে পারলাম। বাড়িতে কাজ করতে আসেন যিনি, তিনিও নাকি মাকে আজ সকালে এসে সেই সাধুবাবার অদ্ভুত কিছু ক্ষমতার গল্প শুনিয়ে গেছেন। সেই সাধুবাবার বেশ কিছু অলৌকিক ক্ষমতার কথা শুনে যেন তাঁর দর্শন পাওয়ার ইচ্ছেটা শতগুণ বেড়ে গেলো। ঠিক করে ঠিকানাটা জেনে নিয়ে আমি রাতেই ফোন করে আমার দুই ছাত্রকে জানিয়ে দিলাম।
রবিবার দিন বিকেলে আমরা তিন জনে সাইকেল নিয়ে রওনা দিলাম পাশের গ্রামে সাধুবাবাজির উদ্দেশ্যে। একটু সন্ধ্যে হয়ে এলেও সঠিক বাড়ি চিনতে খুব বেগ পেতে হলো না কারণ এই ক’দিনেই তিনি খুবই বিখ্যাত হয়ে গেছেন এই গ্রামে। পৌঁছে দেখি ইতিমধ্যেই জনা পঞ্চাশেক লোক জমায়েত হয়েছে, বাড়ির বিশাল উঠোনে। মনে মনে ভেবেছিলাম সাধুবাবা হয়তো কোনো ঘরের মধ্যে বসে থাকবেন, যেখানে হয়তো সামান্য একটা-দু’টো প্রদীপ জ্বলবে। কারণ আলো আঁধারি হলে তবেই তো মানুষকে বোকা বানানো সহজ হয়ে যায়। এই যেমন শূন্যে ভেসে ওঠা, কিংবা মাথার পিছনে আলোকরশ্মি দেখতে পাওয়া কিংবা হঠাৎ কোন জিনিস জাদুবলে হাতে নিয়ে আসা ইত্যাদি। কিন্তু আমায় বেশ খানিকটা অবাক করে দিয়েই সাধুবাবা সেই উঠোনে এসেই বসলেন এবং উঠোনে একটি ইলেকট্রিক বাল্বও জ্বলছে। তবে সাধু শুনলেই মনে যে চিত্রটা ভেসে ওঠে, এনাকে দেখতে ঠিক সেরকমই। মাথায় বিশাল জটা, গলায় অসংখ্য রুদ্রাক্ষ ও রঙিন সব পাথরের মালা, কপালে বিশাল লাল তিলক, সারা দেহ লাল কাপড়ে ঢাকা আর হাতে একটা ত্রিশূল। বয়স বোধ করি ৫০-৫৫ হবে, কিংবা বেশীও হতে পারে। এরপর তিনি প্রায় আধ ঘণ্টা মত খুব সুন্দর কথা বললেন। গীতার কিছু বাণী, তাছাড়াও আধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে বেশ কিছু কথা বললেন; তাও আবার বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তা বোঝালেন। তবে কথাগুলো শুনতে সত্যিই ভালো লাগছিলো এবং এই সব শুনে একটা ব্যাপার স্পষ্ট হয়ে যায় যে এই সাধু ভণ্ড হলেও মূর্খ নন। শুধু বই পড়ে মুখস্থ বলে দেওয়া এক জিনিস, তবে এই বাবাজির বলার ধরণটা সত্যিই বেশ মনোগ্রাহী ছিল। খেয়াল করে দেখলাম বাবাজীর সাথে আরও দু’জন তাঁর চ্যালা আছেন, যারা সর্বক্ষণ পাশেই দাঁড়িয়ে আছে এবং প্রয়োজনে সাধুবাবার নির্দেশ মত কাজ করছে। এরপর তিনি দু’একজনের হস্তরেখা বিচার করলেন এবং আস্তে আস্তে তাদের কিছু বললেন। তারপর এক চ্যালা তাদের এক এক করে ভেতরের একটা ঘরে নিয়ে গেলো। আমার পাশের লোকটিকে জিজ্ঞাসা করাতে তিনি বললেন যে বাবাজি সকলের সামনে দক্ষিণা নেন না এবং তাদের সমস্যা থেকে মুক্তির কি উপায় আছে সেটা তিনি সকলের সামনে বলেন না। তাই তাদেরকে ভেতরে ডেকে নিয়ে গিয়ে আলোচনা করেন। অর্থাৎ, তিনি যে কি ভাবে টুপি পরিয়ে পয়সা আদায় করবেন সেটা বোঝাই গেলো। কিন্তু এরপরই তাঁর অলৌকিক ক্ষমতার পরিচয় পেলাম। একজন বৃদ্ধ মানুষ আসলেন তাঁর সামনে এবং বললেন বেশ কিছু মাস হলো সেই বৃদ্ধের ডান হাতটা প্যারালাইসিস হয়ে গেছে। সে গরীব, তাই ডাক্তারকে অত টাকা দেওয়ার সমর্থ নেই। এখন সাধুবাবা যদি দয়া করে এই কষ্ট থেকে তাকে মুক্তি দেন। সাধুবাবা একটু মুচকি হাসলেন। তারপর সেই বৃদ্ধের ডান হাতের ওপর নিজের ডান হাতটা রেখে চোখ দুটো বুজে বেশ কিছু মন্ত্র উচ্চারণ করলেন। কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধকে বললেন “দেখোতো তুমি হাত নাড়াতে পারছ কিনা ঠিক করে?” সবাইকে অবাক করে দিয়েই সেই বৃদ্ধ হাত নাড়াতে সক্ষম হলেন এবং সবাই মিলে “জয় সাধু বাবাজির জয়” বলে জয়ধ্বনি করতে লাগলো। এরপর সাধু বাবা হঠাৎ ধ্যানস্থ হলেন কিছু সময়ের জন্য। শুনলাম যখনই উনি তাঁর অবিশ্বাস্য দৈবিক শক্তির দ্বারা কোন মানুষকে সারিয়ে তোলেন, যাদের কোনো কঠিন রোগ বা শারীরিক অক্ষমতা আছে, তারপরই তিনি নাকি এইরকম একটু ধ্যান সেরে নেন। কারণ সেই অসাধ্য সাধনে তাঁর শরীর থেকে অনেকটা প্রাণশক্তি দেহ থেকে নির্গত হয়ে যায়, যেটা তিনি আবার ফিরে পান ওই ধ্যানের মাধ্যমে। এই গোটা বিষয়টা হজম করতে পারার আগেই এসে উপস্থিত হলেন আরেক মাঝ বয়সী লোক। তার সারা দেহে অসংখ্য কালো কালো দাগ দেখা যাচ্ছিলো। সাধুবাবা তাঁর পাশে রাখা ধুনচিটা তুলে নিয়ে লোকটির সারা দেহে ধোঁয়া দিতে দিতে কিসব মন্ত্র উচ্চারণ করতে থাকলেন! তারপর বললেন তুই আবার কাল আসিস। এই বলে আজকের মত তাঁর এই ম্যাজিক-শো বন্ধ করলেন। যখন উঠে যাচ্ছি, কেমন জানি মনে হলো উনি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। কিন্তু তারপর আর কিছু বললেন না, ঘরে ঢুকে গেলেন। সুদীপ আর অরিত্রকে বাড়ির চারিপাশটা ভালো করে নজরে রাখতে বলেছিলাম, কোনো ক্যামেরা আছে কিনা? বা কোনো লোক আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে কিনা বা কোনোরকম সন্দেহজনক কিছু ওরা দেখেছে কিনা। ফেরার পথে সুদীপ জানাল যে সেরকম কিছু অস্বাভাবিক ব্যাপার লক্ষ করেনি সে। এদিকে অরিত্রকে বলেছিলাম ওই সারা দেহে কালো দাগ হওয়া লোকটার পিছু নিতে, কিন্তু সে জানাল যে ওই লোকটি বেড়িয়ে যাওয়ার পর নাকি এই বাড়িরই পিছনের দিকে গিয়েছিল। কিন্তু অরিত্র তার একটু পরেই সেখানে গিয়ে লোকটিকে আর দেখতে পায়নি। এটা শুনেই বুঝতে পারলাম, কিছুতো একটা গড়বড় আছে এই ব্যাপারটায়। বাড়ি গিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে হবে।
এরপর দিন স্কুল ছুটি হলে আমি একাই বেড়িয়ে পড়ি সাধুবাবাকে দর্শনের উদ্দেশ্যে। ঠিক করেছি আজ নিজের আসল পরিচয়টা গোপন রেখেই হস্তরেখা বিচার করতে বলবো। আজ সাধুবাবা তন্ত্র নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ খুবই সুন্দর আলোচনা করলেন। এরপর আগের দিনের সেই লোকটি আবার এলো বাবাজীর কাছে এবং সবাই অতি বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখল যে আজ লোকটির সারা দেহে একটি দাগও আর নেই। সাধুবাবার জয়ধ্বনিতে যেন ফেটে পড়লো চারিপাশ। এরপর একজন মধ্যবয়সী লোক এলো গায়ে ধুম জ্বর নিয়ে এবং যথারীতি সেও বাবাজীর দেওয়া চরণামৃত খেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলো। এরপর হস্তরেখা দেখার পালা শুরু হল। আমি সবার শেষে যাব ঠিক করেছি। তার আগে ওই গায়ে জ্বর নিয়ে আসা লোকটির সাথে কথা বলবো ভাবলাম। সে বেড়িয়ে আসতেই তাকে সাধুবাবা সম্পর্কে কিছু কথা জিজ্ঞাসা করলাম এবং কথায় কথায় তার পরিচয়ও জানতে চাইলাম। এরপর তাকেও এই বাড়িটার পিছনে যেতে দেখলাম। তারপর আমি ভেতরে এসে পিছনের দিকে বসে থাকা দু’একজনকে ওই লোকটির সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম এবং একটু আগে আসা ওই গায়ে কালো দাগ হয়ে যাওয়া লোকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করাতেও, কেউ ঠিক বলতে পারলেন না যে তাদের পরিচয় কি? তাদেরকে কেউই আগে দেখেনি বলেই জানাল। সন্দেহটা আমার মনে যেন আরও জাঁকিয়ে বসলো। এরপর আমি সাধুবাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তাঁর ঠোঁটের কোণে যেন একটা অদ্ভুত হাসি খেলে গেলো। কীরকম যেন মনে হলো আমার যে উনি বোধহয় আগে থেকেই জানতেন আমি আসবো কিংবা ওনার ভণ্ডামি সকলের সামনে ফাঁস করার উদ্দেশ্যেই আমার এখানে আসা। আমি বসে কোনো কথা না বলেই ওনার সামনে আগে নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে দিলাম। কিন্তু সে দিকে না দেখে সাধুবাবাজি সোজা আমার চোখে তাকিয়ে বললেন “তুই তখন একাদশ শ্রেণীতে পড়িস। ক্লাসের একটি মেয়েকে খারাপ কথা শুনিয়েছিলিস এবং মেয়েটি হেডস্যারের কাছে কমপ্লেইন করাতে তোর পেরেন্টস কল হয়েছিল। তুই তখন স্যারের হাতে পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়েছিল যাতে কোনোমতেই এই কথাটা তোর বাবা মা না জানতে পারে। ঠিক বললাম তো?” আমার মুখ দিয়ে আর কোনো কথা বের হল না। শুধুই হতভম্ব হয়ে সাধুবাবার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বাকি সকলের মতই সাধুবাবার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে সেখান থেকে চলে আসতে যাব, এমন সময় তিনি বললেন “পারলে কাল আসিস, একটি বিশেষ ঘটনার সাক্ষী থাকতে পারবি।” আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে সেখান থেকে সোজা বাড়ি চলে এলাম। মাথায় শুধু একটাই চিন্তা ঘুরছে। আমার স্কুল জীবনের সব থেকে খারাপ মুহূর্তটার কথা ওই ভণ্ড সাধুর পক্ষে কি ভাবে জানা সম্ভব হল! তাহলে কি শেষ পর্যন্ত আমায় হার মানতে হবে? মেনে নিতে হবে যে ওই সাধুর সত্যিই কোনো অলৌকিক ক্ষমতা আছে। কাল আমাকে যেতেই হবে। আর কি এমন ক্ষমতা আছে তাঁর, সেটা আগে দেখি, তারপর ভেবে দেখবো সাধু বাবার রহস্যময় ক্ষমতার উৎস ঠিক কি?
আজ সারাদিন স্কুলে মন বসাতে পারেনি। আমার সমস্ত চিন্তাশক্তিকে যেন ওলট পালট করে দিয়েছেন ওই সাধু বাবা। বিকেল হতেই ছুটলাম তাঁর ডেরায়। তবে কাল থেকে আরেকটা জিনিস আমায় বড্ড ভাবাচ্ছে। আমি যখন গতকাল বাবাজির পা ছুঁয়ে প্রণাম করেছিলাম, একটা জিনিস চোখে পড়েছিল। বাবাজীর দুটি পায়ে-ই মাঝের দু’টি করে আঙুল অস্বাভাবিক রকম জোড়া। আর আমার কাল রাত থেকে বার বারই মনে হচ্ছে যে এই আঙুল আমি আগেও কোথাও দেখেছি। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছি না, কোথায় এবং কার পায়ে?
ওখানে পৌঁছে জানতে পারলাম যে বাবাজী নাকি আজ কি সব যজ্ঞ করবেন এবং তার ফল স্বরূপ নাকি কুণ্ডলিনী চক্র জাগরণের ফলে তার কপাল থেকে এক আলোকছটার বিচ্ছুরণ দেখা যাবে। সেই মুহূর্তে উপস্থিত সকল ভক্তের মনস্কামনাও নাকি পূর্ণ হবে সাধু বাবার আশীর্বাদ নিলে। ব্যাপারটা ভীষণই ইন্টারেস্টিং লাগলো আমার। হোম কুণ্ডে সাধু বাবা আগুন জ্বালানোর জন্য কোনো রকম দাহ্য পদার্থ ব্যবহার না করেই, শুধুমাত্র মন্ত্র বলে আগুন জ্বালিয়ে দিলেন। আর এই দৃশ্য দেখেই এখানে উপস্থিত সকলেই যে ওনাকে ঈশ্বর রূপেই দেখতে শুরু করলো, তা তাদের প্রণাম করার বহর দেখেই বোঝা যায়। একমাত্র আমাকে উনি এই জাদু দেখিয়ে ইমপ্রেস করতে পারলেন না। কারণ এই জাদু বুঝিয়ে দেয় বাবাজি কেমিস্ট্রিটাও হয়তো জানেন। পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট হোমকুণ্ডে রেখে হাতের খেলায় সবার চোখের আড়ালে তার ওপর দুই-তিন ফোঁটা গ্লিসারিন দিলেই আগুন জ্বলে উঠবে, সেই বিজ্ঞানটা ভালো করেই বোধহয় জানা আছে বাবাজির। বেশ কিছুক্ষণ আগুন জ্বেলে এবং অত্যন্ত কঠিন কিছু মন্ত্রোচ্চারণের দ্বারা হোম শেষ করার পর সত্যি সত্যি যখন দেখলাম তার কপাল থেকে এক প্রকার লালচে আলো নির্গত হচ্ছে, মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে আমিও তার দিকে চেয়ে থাকতে এক প্রকার বাধ্য হলাম। এরপর ওখানে উপস্থিত প্রত্যেকে সাধুবাবার পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নিতে থাকলো। আমিও সেই লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লাম। আশীর্বাদ নেওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়, বাবাজির কপালটা ভালো করে লক্ষ করাটাই আমার উদ্দেশ্য। সাধুবাবা এখন দুই চোখ বন্ধ করে ধ্যানে মগ্ন। ডান হাতটি সামনের দিকে আশীর্বাদ করার ভঙ্গিতে ওপরের দিকে তোলা। ডান পা মুড়ে বসে আছেন, আর বাঁ পা-টি সামনের দিকে রাখা যেটি ছুঁয়ে সকলেই প্রণাম করছেন তাঁকে। আমার পালা আসতেই, প্রণাম করার আগে ভালো করে তাকালাম তাঁর কপালের দিকে। ঠিক যেন মনে হচ্ছে তাঁর কপালের চামড়া ভেদ করে একটা ক্ষীণ অথচ জীবন্ত লাল আলোক শিখা ঠিকরে বেড়িয়ে আসছে। দূর থেকে ভেবেছিলাম হয়তো কোন লেজার লাইট জাতীয় কিছুর কারসাজি আছে। অথচ সামনে থেকে দেখে সেই ধারণাও ভুল প্রমাণিত হল। তারপর আবারও প্রণামের সময় সেই জোড়া আঙুল দেখে যেন আমার সব গুলিয়ে যেতে লাগলো। কিছুতেই যেন নাগাল পাচ্ছিনা এই রহস্যের।
পরের দিন সকালে উঠে শুনতে পেলাম আরেকটা অদ্ভুত ঘটনা। আমাদের গ্রামেরই এক পরিত্যক্ত পুকুরে নাকি ২৯-৩০ বছরের একটি ছেলের লাশ পাওয়া গেছে। থানায় একজন অফিসার আছেন যিনি আমার বাবার বন্ধু হন। আমার কি মনে হতে, স্কুল ছুটির পরে তাঁকে একবার কল করে একটু ডিটেলসটা জানতে চাইলাম। তিনি জানালেন যে ছেলেটিকে শ্বাসরুদ্ধ করে মারা হয়েছে বলেই মনে করছে পুলিশ। কারণ শরীরে কোনো ক্ষতচিহ্ন নেই আর বিষক্রিয়া হলে শরীর নীলচে হয়ে যেত। কিন্তু ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, ছেলেটির কোনো পরিচয় পাওয়া যায়নি এবং থানায় কোন মিসিং ডায়েরি কেউ করেনি বা কেউ লাশটার খোঁজও এখনও করতে আসেনি। যাই হোক, আপাতত খুনের কথা ভুলে চললাম সাধুবাবার সাথে চতুর্থ সাক্ষাৎ করতে।
আজ আর আমি একা নই, সঙ্গে অরিত্রকেও নিয়েছি। আজ দেখবো সাধুবাবার কত ঐশ্বরিক ক্ষমতা আছে। অরিত্রকে বলেছি কান্নাকাটি জুড়ে দিয়ে একটু অভিনয় করতে। বাকিটা আমি যা বলার বলবো। আজ সাধুবাবার সভায় লোকজন আরও বেশী। হয়তো গতকাল রাতের কপাল থেকে আলোকরশ্মি বের হবার কথা আজ সারা গ্রামে ছড়িয়ে পরতেই এমন ভক্ত সমাগম হয়েছে। আরও দু’টো বিষয় আজকে অন্য দিনের থেকে আলাদা। এক, আগের তিন দিনই কিন্তু বাবাজির পিছনে দু’জন চ্যালা দাঁড়িয়ে থাকতো। তবে আজ একজনই আছে। দুই, বাবাজি রোজকারের মত আজ আধ্যাত্মিকতার গূঢ় তত্ত্ব নিয়ে কিছু আলোচনা না করে চোখ বন্ধ অবস্থায় ধ্যান করছেন। প্রথমেই পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা ওই চ্যালা বলল গতকালের যজ্ঞ শেষে গুরুদেব বিশেষ সাধনায় লিপ্ত হয়েছেন। তাই এরপরের এক মাস আপাতত তিনি বেশী কথা বলবেন না। ব্যাপারটা শুনেই সন্দেহটা আরও যেন বেড়ে গেলো। যাই হোক, এরপর একটা আমাদের বয়সী ছেলে অসহ্য পেটে যন্ত্রণা নিয়ে বাবাজির সামনে এলো এবং যথারীতি বাবাজি মন্ত্রোচ্চারণের সাথে একটা কলা ছেলেটাকে দিয়ে খেতে বলল। কিছুক্ষণ পর ছেলেটি অনেকটাই সুস্থ বোধ করছে জানাল এবং সে চলে গেলো। তারপরই আমি সাধুবাবার কাছে অরিত্রকে নিয়ে গিয়ে বসলাম। আগের দিন যে হাসিটা আমায় দেখে সাধুবাবার মুখে ফুটে উঠেছিল, আজ সেটা খুঁজে পেলাম না। আমি বললাম “বাবাজি এটা আমার মাসতুতো ভাই। গত দু’বছর মাধ্যমিক দিয়েও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারছেনা। আপনি দয়া করে কিছু করুন।” সাধুবাবা বেশ কিছুক্ষণ অরিত্রর দু’টো হাত দেখে নিয়ে মুখের দিকে চেয়ে বললেন “ওদের কোনো আত্মীয় ওর ক্ষতি করার চেষ্টা করছে। একটা যজ্ঞ করতে হবে বাড়িতে। আপনারা একটু অপেক্ষা করুন। শেষে আপনাদের সাথে আমি কথা বলছি আবার।” হঠাৎ মনে হলো বাবাজির গলার স্বরটা কি আজ একটু অন্যরকম শোনাল? মনে কিরকম যেন একটা খটকা লাগলো। চাইলে এখনই সবার সামনে সাধুবাবার মুখোশটা খোলা যেত। কিন্তু না, আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজা বাকি আছে। তাই এখন চুপ থাকাই ভালো। এরপর অরিত্রকে প্রণাম করতে বলার পর যেই আমি সাধুবাবার পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে গেছি, তৎক্ষণাৎ একটা বিষয় লক্ষ করে আমার সব এলোমেলো হয়ে যাওয়া চিন্তাগুলো যেন এক মুহূর্তের মধ্যে বিদ্যুৎ ঝলকানির মতই মাথায় এসে হাজির হল। অরিত্রকে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এসেই ফোন করলাম বাবার সেই বন্ধু অফিসার আঙ্কলকে। আমি বললাম “আঙ্কল আপনার কাছে নিশ্চয়ই আজকে সকালে পাওয়া লাশটার ছবি তোলা আছে। পুরো বডিটার ছবিটা আমায় যদি একটা বার পাঠান তাহলে খুবই উপকার হয়।” ফোনের ওপাশ থেকে অফিসার আঙ্কল বললেন “দেখো প্রদীপ্ত, তোমার কিছু জানার থাকলে আমায় জিজ্ঞাসা করতে পার। যতটা জানি আমি তোমায় বলার চেষ্টা করবো। কিন্তু ছবি পাঠানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে তুমি ছবি একান্তই দেখতে চাইলে কাল একবার সময় করে থানায় চলে এসো না হয়।” আমার যেটা জানার ছিল, সেটা আমি ফোনে শোনা মাত্রই আঙ্কলকে বললাম “কাল আমি অবশ্যই থানায় আসবো। আর আমার এই কেসটার ব্যাপারে কেন এতো ইন্টারেস্ট, সেটা আমি কালকে গিয়েই আপনাকে সবটা বলছি। যে সন্দেহটা মনের আড়ালে একটু একটু উঁকি দিচ্ছিল সেটাই এখন সত্যি বলে মনে হচ্ছে। তবুও সবটা এখনও পরিষ্কার হচ্ছেনা। তাই আরেকটু ভেবে দেখার আছে। কাল দেখা হচ্ছে আঙ্কল, গুড নাইট।”
বাড়িতে ঢুকতেই দেখলাম মা, বাবা বসে টিভিতে সৃজিত মুখার্জি পরিচালিত ‘Vinci Da’ (‘ভিঞ্চি দা’) সিনেমাটা দেখছে। ঘরে ঢুকতেই মা জিজ্ঞাসা করলো “কীরে, এই সিনেমাটা দেখেছিলি? বেশ থ্রিলিং কিন্তু।” আমার মনে এখন অন্য চিন্তা ঘুরছে। তাও টিভির দিকে তাকিয়ে বললাম “হ্যাঁ, দেখেছিলাম। ওই প্রস্থেটিক মেকআপ নিয়ে তো……।” কথাটা শেষ করতে না করতেই আমার মাথায় দ্বিতীয় বার যেন বিদ্যুৎ ঝলকানির মতই আবার সকল চিন্তাগুলো জেগে উঠলো। আর এবার তারা যথেষ্ট সক্রিয়। মনে হচ্ছে এবার সব খটকা, সন্দেহ গুলোকে এক জায়গায় সাজাতে পারবো। তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া শেষ করে বসলাম ঠাণ্ডা মাথায় গত চারদিনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি ভাবতে।
সকালে তাড়াতাড়ি স্নান, খাওয়া সেরে স্কুলে যাওয়ার আগে, সোজা রওনা দিলাম থানার উদ্দেশ্যে। সেই অফিসার আঙ্কল বললেন “হ্যাঁ প্রদীপ্ত বলো, তোমার ঠিক কি সন্দেহ হচ্ছে বা মনে হচ্ছে এই কেসটা নিয়ে?” আমি বলতে শুরু করলাম “আঙ্কল, আপনি তো জানেনই আমি একটা বিজ্ঞান ক্লাব চালু করেছি আমাদেরই স্কুলের কিছু ছাত্রদের নিয়ে। আমাদের প্রধান উদ্দেশ্যই মানুষের মন থেকে সকল কুসংস্কার দূর করে, বিজ্ঞানের আলোয় পথ চলতে শেখানো। তাই পাশের গ্রামের এই সাধুবাবার খোঁজ পাওয়া মাত্রই আমি আর দেরি করিনি। প্রথম দিন আমি ওনাকে শুধু লক্ষ করি। কিন্তু ওনার ভণ্ডামি ফাঁস করার জন্য ওনার সাথে কথা বলাটাও দরকার ছিল। কিন্তু অদ্ভুত ভাবেই দ্বিতীয় দিন যখন ওনার সাথে আমার সাক্ষাৎ হল, উনি আমারই স্কুল জীবনের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। অথচ সেই ঘটনার কথা আমার মা, বাবাও এখনও পর্যন্ত জানেন না। আমি ভীষণই অবাক হয়ে বাড়ি ফিরে আসি। আর এই দুই দিনে প্রায় ৩-৪ জন শারীরিক ভাবে অসুস্থ মানুষকে ওনার অলৌকিক শক্তির দ্বারা সম্পূর্ণ সুস্থ করে দেওয়ার ব্যাপারটাও আমাকে যথেষ্ট ভাবিয়েছে। যাই হোক, তৃতীয় দিন গিয়ে আরও অবিশ্বাস্য জিনিস দেখা বাকি ছিল। বাবাজির কপাল থেকে বের হওয়া লাল জ্যোতি। আমি সামনে থেকে ওনার মুখের দিকে তাকিয়েও ওনার কারসাজিটা ঠিক ধরতে পারছিলাম না। কিন্তু চতুর্থ দিন, অর্থাৎ গতকাল সন্ধ্যেবেলায় ঘটলো একটা আশ্চর্য ঘটনা। দ্বিতীয় আর তৃতীয় দিন আমি সাধু বাবার সঙ্গে দেখা করার পর তাঁকে প্রণাম করি এবং লক্ষ করি তাঁর পায়ের মাঝের দু’টি আঙুল অস্বাভাবিক রকম জোড়া। অথচ, গতকাল আমি আবারও যখন সাধু বাবাকে প্রণাম করতে যাই, দেখি তাঁর পায়ের আঙুলগুলি স্বাভাবিক, আর সকলের পায়ের মতই। বুঝতে আর অসুবিধা হলো না যে বাবাজি শুধু ভণ্ড, তাই নয়, তাঁর এই সাধুর সাজপোশাক-টাও নকল। তার থেকেও বড়ো কথা, সেই মানুষটাই গতকাল পাল্টে গিয়েছে হঠাৎ করে। তাই কি মনে হতে আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করি গতকাল সকালের লাশটার পায়ের ব্যাপারে। আপনি যখন জানালেন সেই লাশেরও পায়ের মাঝের দু’টি আঙুল জোড়া, আমার মন বলছিল যে এতটা কোইন্সিডেন্স কি আদেও সম্ভব? তবুও সব কিছু যেন ঠিক মেলাতে পারছিলাম না। কিন্তু গতকাল রাতে যখন টিভিতে ‘ভিঞ্চি দা’ সিনেমাটা দেখতে গিয়ে প্রস্থেটিক মেকআপ-এর কথাটা মনে এলো, তখন পুরো ঘটনাগুলো যেন নিজে থেকেই অল্প অল্প করে জুড়তে শুরু করলো। যার লাশ আপনারা পেয়েছেন তিনিই সম্ভবত আগের ভণ্ড সাধুবাবা। আর গতকাল রাতে আমি যাকে দেখেছি, তিনিই হয়তো এই দলেরই প্রস্থেটিক মেকআপ আর্টিস্ট। নিজেদের মধ্যেকার কোন বিবাদ বা আক্রোশ থেকেই দুই দিন আগে তারা আগের সাধুবাবাকে খুন করে। এই মেকআপ আর্টিস্টই সম্ভবত কখনও বুড়ো, কখনও মাঝ বয়সী লোক সেজে প্রতিদিন আসতেন নানান শারীরিক সমস্যা নিয়ে। আর সেই কারণেই একবার সাধুবাবার সাথে কথা হয়ে গেলে বাইরে বেড়িয়ে আবার এই বাড়ির পিছনের পথ দিয়ে এই বাড়ীতেই প্রবেশ করতো। আর ঠিক এই কারণেই ওখানে উপস্থিত কেউই সেই মেকআপ করা মানুষটিকে চিনতে পারতেন না বা কেউ তাঁকে কোন দিনও দেখেও নি। সাধুবাবার মাথার ওই লাল আলোর রহস্যও এবার বুঝতেই পারছেন নিশ্চয়ই। কোনো প্রকার ছোট এল.ই.ডি লাইটকে প্রস্থেটিক মেকআপ-এর দ্বারা অত্যন্ত নিখুঁত ভাবে কপালে বসানো হয়েছিল। গতকাল রাতে সম্ভবত দুই জন চ্যালার একজন-কে মেকআপ করিয়ে অসুস্থ রোগী বানানো হয়েছিল। আর সেই মেকআপ আর্টিস্ট নিজের মুখ আর হাতে খুবই নিপুণতার সাথে প্রস্থেটিক মেকআপ করলেও, পায়ের আঙুলটা জোড়ার কথা নয় ভুলে গিয়েছিল, আর না হলে ওই ব্যাপারটা সে লক্ষই করেনি। বেশী কথা বললে অনেকের সন্দেহ হতে পারে, কারণ প্রস্থেটিক মেকআপ-এর দ্বারা তো আর কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করা যায়না। তাই সাধনা চলছে, এই অজুহাতে কম কথা বলার নাটকটা করতে থাকে। তবুও বলতেই হয়, সে গলাটা অনেকখানিই নকল করে ফেলেছে। এখন আসল সত্যটা ঠিক কি, সেটা তো আপনারা জেরা করলেই জানতে পারবেন। যতটা আমার মনে হলো আমি বলে দিলাম।” টানা অনেকক্ষণ কথা বলা শেষ করে আমি একটু থেমে জল খেলাম। সেই আঙ্কল বললেন “কি বলছ প্রদীপ্ত? তুমি তো পুরো পাকা গোয়েন্দার মত বলে গেলে এতক্ষণ। তবে একটা জিনিস। তোমার যুক্তি সবই বুঝলাম, কিন্তু আগের সাধুবাবা তোমার স্কুলের ঘটনা জানলো কি করে?” আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বললাম “একাদশ শ্রেণীতে যখন উঠলাম, আমাদের স্কুলে প্রলয় নামে একটি ছেলে বিজ্ঞান বিভাগেই আমাদের সাথে ভর্তি হল। সে সব সময় জাদু দেখাতে ভালোবাসতো এবং এও বলতো যে সে বড়ো ম্যাজিশিয়ান হতে চায়। আমরা সবাই ওর পিছনে লাগতাম খুব। একবার শিক্ষক দিবস উপলক্ষে স্কুলে একটা অনুষ্ঠানে প্রলয়ের জাদু দেখানোর কথা ছিল। আমি ওর কিছু সরঞ্জাম অদলবদল করে দেওয়াতে, প্রলয় ভালো করে সেই খেলা দেখাতে পারেনি। সেই রাগে একবার আমায় ইচ্ছে করে ফাঁসিয়ে দিয়েছিল আমাদের ক্লাসের এক মেয়ের সাথে। কিছু ভুল বোঝাবুঝি হয় এবং আমি মেয়েটাকে রাগের মাথায় কিছু খারাপ কথা শুনিয়ে দি। পরে যদিও মেয়েটা বুঝতে পারে যে আসল দোষ প্রলয়ের ছিল। ওই নকল সাধু যখন সেদিন কথাটা বলল, আমি অবাক হয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু পরে এটা ভেবে আরও সন্দেহ হয় যে শুধু আমার দোষের কথাটাই সে বলল কেন? আমি যে নির্দোষ ছিলাম সেটাও নিশ্চয় সে জানবে। এই সব কথা ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ প্রলয়ের নামটা আমার মাথায় আসে। তার বেশ কিছু কারণ আছে। এক, স্কুলের অনেক ঘটনা থাকা সত্ত্বেও ওই নির্দিষ্ট ঘটনাটা তুলে আনা। দুই, সেই পায়ের আঙুল। সাধু বাবার জোড়া আঙুল দেখার পর থেকেই আমার বার বার মনে হতে থাকে যে এই আঙুল আমি আগেও কোথাও দেখেছি। প্রলয়ের নামটা মনে পড়ায় খেয়াল হলো যে ওর পায়েও এরকমই আঙুল ছিল আর সেটা দেখে আমরা মজা করতাম খুব। তিন, ও জাদুগর হতে চেয়েছিল। আর বাবাজিও যে বেশ ভালোই জাদু দেখিয়ে মানুষকে বোকা বানাচ্ছেন, সেতো চোখের সামনে দেখতেই পাচ্ছিলাম। আর সব শেষে, যেটা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় – যে লাশটা পাওয়া গেলো, তার বয়স আমারই মত, আর সেই যদি ধরেনি ভণ্ড বাবাজি, তাহলে তো সব কিছু মিলেই যাচ্ছে। পরবর্তী কালে হয়তো বাড়ির সাথে যোগাযোগ রাখেনি। আর সেই জন্যই প্রলয়ের বাড়ির লোক ওর খোঁজ আর করেনি।” এবার আঙ্কল আমায় একটা ডেড বডির ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন আমি তাঁকে চিনি কিনা? আমি জানালাম “মুখটা কিছুটা পাল্টে গেলেও, এটা প্রলয়েরই বডি। প্রথম দিন ও আমায় দেখেই চিনতে পারে, আর সেই জন্যই আমার মনে হয়েছিল যেন ও আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে।” নিজের এক পুরনো বন্ধুকে এই ভাবে দেখতে আমার খুব একটা ভালো না লাগলেও কি করা যাবে, এটাই তার নিয়তি। এতো দিন ধরে অনেক গরীব মানুষের লুটেছে সে প্রতারণা করে। তাদেরই অভিশাপে আজ এমন পরিণতি নেমে এলো প্রলয়ের জীবনে। যাই হোক, আঙ্কল বললেন “তুমি তাহলে এখন স্কুলে যাও। কোন দরকার পরলে আমি তোমায় ডেকে নেব। এখন আপাতত আমি বাবাজির ডেরায় গিয়ে সব কটাকে আগে গ্রেফতার করে নিয়ে আসি। গায়ে দু’ঘা লাঠির বাড়ি পড়লেই সব সত্যি বেড়িয়ে আসবে। সন্ধ্যের দিকে আমি ফোনে তোমায় জানাচ্ছি। আর এতটা হেল্প করার জন্য অনেক ধন্যবাদ তোমায়।”
অফিসার আঙ্কল পরে জানায় যে ওই মেকআপ আর্টিস্ট সব কথা স্বীকার করেছে। সে আর প্রলয় একসাথে এই লোক ঠকানোর ধান্দা শুরু করেছিল ২ বছর আগে থেকে। কথা হয়েছিল দু’জনে সমান ভাগ নেবে। কিন্তু পরের দিকে যখন আয় বাড়তে থাকে, প্রলয় তাকে কম ভাগ দিত। এই নিয়ে বেশ কিছু মাস ধরে ওদের মধ্যে অশান্তি চলছিল। আর তারপরই ওই মেকআপ আর্টিস্ট মনে মনে প্রলয়কে খুন করার ছক কষতে থাকে। ওরা এইরকম কোন ভক্ত জুটিয়ে নিয়ে সেই পাড়ায় বা গ্রামে গিয়ে ১-২ মাস কাটিয়ে আবার অন্য জায়গায় পালায়। প্রলয়ের আসল চেহারা কেউ জানে না এবং তার বাড়ির লোকেরও কোন খোঁজ নেই। তাই তাকে মেরে নিজে সাধু বাবা সেজে পালাতে চেয়েছিল ওই মেকআপ আর্টিস্ট। আমি প্রলয়কে চিনতে না পারলে, হয়তো এই খুনের কিনারা করাও পুলিশের পক্ষে কঠিন হয়ে যেত। ওই দুই চ্যালাও এই খুনের ব্যাপারটা জানতো। তাই তিনজনেই আপাতত জেলে বন্দী।
আজ আবারও আমাদের বিজ্ঞান ক্লাবে এসেছি। আমার সব ছাত্ররাও এসেছে। আর আজকে আরও একজন আমাদের মধ্যে উপস্থিত – সেই অফিসার আঙ্কল। তিনি সবার উদ্দেশ্যে পুরো গল্পটা জানিয়ে বললেন “তোমরা এই ভাবেই এগিয়ে যাও বিজ্ঞানের হাত ধরে। আমাদের থানার তরফ থেকে তোমাদের পুরষ্কার স্বরূপ কিছু আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থা করবো। এরপর বিজ্ঞান মেলাটা আরও বড়ো করে তোমারা করবে। আমাদের তরফ থেকে সব রকম সাহায্য তোমরা পাবে। আমি তাহলে এখন আসি প্রদীপ্ত।” এরপর সুদীপ আমায় বলে উঠলো “স্যার, আপনি তো পাক্কা ফেলু মিত্তির-এর মত কেসটা সমাধান করলেন। আমার মনে হয়, শিক্ষকতার পাশাপাশি এবার থেকে আপনি গোয়েন্দাগিরি-টাও শুরু করে দিন।” ফেলুদার স্টাইলেই গলাটা একটু ভারী করে আমি বললাম “বলছিস?”