|
Getting your Trinity Audio player ready...
|
“এই এত আলো, এত আকাশ আগে দেখিনি…”…রেওয়াজের অভাব ধরা পড়লেও সুরেলা কণ্ঠটা বেশ মন কাড়া নীনার৷ খুশি খুশি মনে গান গাইতে গাইতে গাছে জল দিচ্ছিল নীনা৷ পেছনে কখন যে পিউ আর অনীশ এসে দাঁড়িয়েছে তা ও জানতেই পারেনি৷ এতক্ষণে পিউ এর ডাকে ও সচকিত হল৷
“মাম্মি আরেকটু কর না৷”
“করব কিন্তু তুমি হোম ওয়ার্ক করেছো তো? আন্টি কিন্তু বকবে না হলে৷”
“হ্যাঁ গো ঠিকঠাক পড়েছে ও? পড়িয়েছ ঠিক করে?”
“নাঃ আমিও ‘এত আলো, এত আকাশ’ দেখতে এসেছি৷” একটা আলগা খুনসুটির সূত্রপাত হওয়ার আগেই হঠাৎ নীনা চিৎকার করে উঠল, “আহহহহহহ্!!!”
“নীনা কি হল?
ইস্ কি অবস্থা!!!”
বেখেয়ালে ক্যাকটাসের কাঁটায় নীনার পিঠ টা ক্ষত বিক্ষত হয়ে গেছে৷
ক্ষতটা স্যাভলন দিয়ে ধুয়ে অয়েনমেন্ট লাগাতে লাগাতে অবাক হল অনীশ৷ কাঁটা লাগা জায়গাটা দেখে মনে হচ্ছে কেউ যেন গায়ের জোরে আঁচড় কেটেছে কিন্তু অনীশ হলফ করে বলতে পারে এত জোরে ও নীনাকে ঠেলেই নি বরং বলা ভাল খানিক আলগা জড়াতে গেছিল কেবল৷ কিভাবে ঘটনাটা ঘটল তা ওর ভাবনারও অতীত৷
“নীনা ক্যাকটাসটা তো আমি ছাদে রেখে এসেছিলাম৷আনলে কেন আবার নীচে?কিরকম বিচ্ছিরি ঘটনাটা ঘটল বলতো?”
“ক্যাকটাসটাকে ছাদে রেখে এসেছিলে??”
“হ্যাঁ তো৷”
“তাহলে সেটা স্বপ্নে৷”
“মানে?”
“মানে, ক্যাকটাসটা নতুন বাড়িতে আসার পর থেকে এখানেই আছে৷”
“আরেহ্ দূর, আমি নিজে ওটাকে…”
“আচ্ছা বাবা৷তুমি রেখে এসেছিলে৷ভুতে নিয়ে এসেছে, কেমন? তুমি এখন আর্গু করা ছেড়ে ঝপ করে স্নান টা সেরে এস দেখি৷আমি ততক্ষণে মাম্মাই কে খাইয়ে দিই৷তারপর দুজনে গলদা চিংড়ির মালাইকারি দিয়ে লাঞ্চ সারবো৷”
* * *
দিন দশেক হল নীনারা উঠে এসেছে এই নতুন বাড়িটায়৷ অনীশ বর্ধমানে বদলী হয়ে আসার পর থেকেই ওরা হন্যে হয়ে একটা নতুন বাসার খোঁজ করছিল৷ ফ্ল্যাট ব্যাপারটা দুজনেরই খুব অপছন্দের৷ এক চিলতে ছাদ একটা বড়ই প্রয়োজন৷ অফিস ফিরে ছোট্ট একটা সান্ধ্য আড্ডা ছাদেই জমে ভালো৷ যাইহোক কদিন বিজ্ঞাপনের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতো এই বাড়িটার বিজ্ঞাপন নজরে আসে ওদের৷ যোগাযোগ করে বাড়ি মালিকের সঙ্গে৷ বিপত্নীক মি. অবিনাশ বোস বিদেশে একমাত্র মেয়ের কাছে চলে যাচ্ছেন বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে৷ ছিমছাম দোতলা সুন্দর বাড়ি৷ ১২০০ স্কোয়ার ফুটের খোলামেলা বাড়ির সাথে লাগোয়া উঠোনটা দেখে প্রথম দিন প্রায় নেচে উঠেছিল নীনা৷ এ তো মেঘ না চাইতেই জল৷ বাড়ি ঘুরে দেখতে দেখতে আদুরে গলায় বলেছিল, “এ আমাদের স্বপ্ননীড়৷তাই না বলো?” সেইমত নেমপ্লেট তৈরি করতে দিয়ে দিন পনেরোর মধ্যেই ওরা টুকটাক সাজিয়ে নিল বাড়িটা৷
অনীশের মা বিশাখা একটু আপত্তি করেছিলেন “বাবু তোরা ঝোঁকের মাথায় একটা গোটাগুটি বাড়ি কিনে ফেললি??!! কারোর সাথে একটু আলোচনা করলি না! একজন অচেনা লোক হুটহাট করে একটা বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে চলে গেলো আর তোরাও বাড়িটার কোন দোষ-টোষ আছে কিনা না জেনে সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে নিলি??!” বিশাখার কথার যুক্তি তখন নীনার খুশি খুশি মনের কাছে বিরক্তিকর ঠেকল৷ ও বলল “আঃ মা এখনকার দিনে এসব বাড়ির দোষ-টোষ কে মানে বলুন তো? আমরা এখনকার দিনের ছেলেমেয়েরা আপনাদের মত কি ওসব বাজে অযৌক্তিক ব্যাপারকে কোন আমল দিই? আর আপনার ছেলেও তো একজন বোঝদার মানুষ৷ সে কি না বুঝে শুনেই নিয়ে নিল? আর আমরা কার কাছ থেকেই খোঁজ নিতাম বলুন? আমাদের বাড়ির পিছনে একটা ঝিল বা দীঘি টাইপের আছে, ওটার নাম রাণী সায়র আর দুপাশে লোকের কেনা জমি পতিত পড়ে রয়েছে৷সামনে রাস্তা আর রাস্তার ওপারে ফ্ল্যাট তৈরির
কাজ চলছে৷এবার আপনিই বলুন কার কাছে খোঁজ নিতে যাবো?আমাদের তো বরং পাড়া পড়শির ঝক্কি নেই বলেই আরও বেশি ভালো লেগেছে৷ কি গো বলনা?”
সায় দিল অনীশ৷ ছেলে বৌমার আচরণ বুঝে চুপ করে গেলেন বিশাখা৷ পিউ কে কাছে টেনে নিয়ে বললেন, “নতুন জায়গা পিউদিদি৷ সাবধানে লক্ষ্মী হয়ে থেকো কেমন? বাবা মা এর কথা শুনো কেমন? নতুন স্কুলে মন দিয়ে লেখাপড়া কোরো৷” ঠাম্মির কোলে মাথা গুঁজে দিয়েছিল পিউ৷
* * *
জমিয়ে lunch সেরে একটু ভাত-ঘুম দিচ্ছিল অনীশ৷ একটা গুমরোনো কান্নার শব্দে হঠাৎ ঘুমটা ভেঙ্গে গেল ওর৷ পাশের ঘর থেকে আসছে শব্দটা৷ এ তো পিউ কাঁদছে৷ ঝটিতি ও ঘরের দিকে দৌড় দিল অনীশ৷গিয়ে দেখে পিউ এর সামনে বসে নীনা মাথার সব চুলগুলো মুখের সামনে এনে বিচ্ছিরি রকম হাঁপাচ্ছে৷হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে যেন৷ অগোছালো চুলগুলো হাতে করে সরিয়ে দিল অনীশ৷ নীনার হাঁপানির ধাত আছেএকটু৷ দিন-কতক
তার প্রকোপটা বেড়ে গেছে যেন৷এখন শীতকাল নয় তবে কেন এমনটা হচ্ছে??!! ইনহেলারটা এগিয়ে দিল নীনাকে৷ নীনা আস্তে আস্তে ধাতস্থ হচ্ছে৷ কিন্তু পিউ এখনো আতঙ্কের মধ্যে৷ ওকে কোলে নিয়ে শান্ত করছে অনীশ৷ নাঃ! নীনাকে একবার ডক্টর ভিসিট করিয়ে আনার দরকার পড়ছে৷ এখানে আসার পর থেকে সমস্যাটা বেড়েছে৷ নতুন শহরে দূষণজনিত সমস্যা হতে পারে৷
(২)
পরের দিন বিকেলে নীনা একটু টুকিটাকি কেনাকাটি করতে বেড়িয়েছিল৷ ফেরার পথে এক মাঝবয়সি ভদ্রমহিলা এগিয়ে এলেন৷
“আপনাকে ঐ রায়বাবুর বাড়িতে দেখলাম সেদিন বারান্দায়৷আপনারা…?”
“হ্যাঁ আমরা ঐ বাড়িটি কিনেছি৷ থাকতেও শুরু করেছি৷ আপনি?”
“আমি আপনার বাড়ির উল্টোদিকে একটু কর্ণারে যে সবুজ বিল্ডিং টা আছে ওটার চার তলায় থাকি৷ ও আপনি খেয়াল করেননি৷ খানিকটা দূরত্ব আছে আর তাছাড়া আমি খানিকটা কৌতূহল বসতই খেয়াল করেছি৷ আসলে প্রায় বছর দুয়েক বাদে বাড়িটাতে লোকজন দেখলাম তাই স্বভাবতই…”
কথা শেষ হল না তার আগেই ভদ্রমহিলার মোবাইল বেজে উঠল৷
“সরি ..আরেকদিন কথা হবে৷আপনাকে আমার কিছু কথা বলতে ইচ্ছে করছে৷ আরেকদিন সময় হলে বলব৷ নমস্কার৷”
নীনা প্রতিনমস্কার জানিয়ে বাড়ির পথ ধরল৷ মনটা খচখচ করতে লাগল৷ কি বললেন এই ভদ্রমহিলা? প্রায় বছর দুয়েক বাড়িটা জনমানবহীন! আবার বললেন ‘রায়বাবুর বাড়ি!’ কিন্তু তা কি করে সম্ভব?! বাড়ি মালিকের নাম অবিনাশ বসু তো৷ ভুল করে ‘বসু’ কে ‘রায়’ বললেন?!
অবিনাশবাবু যে বলেছিলেন বাড়িটাতে উনি রীতিমত বসবাস করতেন৷ শেষ এক দু মাস কেবল এক আত্মীয়বাড়িতে থেকে বাড়িটাকে বিক্রির জন্য টুকটাক কাজ আর পরিষ্কার করিয়েছেন মাত্র৷ তবে?!
অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল নীনা৷ ওর বাড়ি ঢোকার ছোট রাস্তাটা ধরে একটু এগোতেই এক বুড়ি পাগলি ছুটে এল ওর সামনে৷
“ঐ অমঙ্গলে বাড়িটায় এসে উঠলি হারামজাদি!!!তোর সর্বনাশ হবে৷পালা৷পালা৷ যাঃ৷”
হতবাক হয়ে দাঁড়িয়েছিল নীনা৷হঠাৎ একজন মাঝবয়সি ভদ্রমহিলা তার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যেতে লাগল আর বলল “কিছু মনে করবেন না৷ আমার শাশুড়ি মা এর মাথার গণ্ডগোল আছে৷মাঝে মাঝে এরকম জ্বালাতনে পড়ি৷
চলুন মা, ঘরে চলুন৷”
নীনার মাথার ভেতরটা ক্রমশ জট পাকাচ্ছে৷ এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সবকিছু৷
বাড়ি ফিরে একটু অনীশের সাথে কথা বলতে পারলে ভালো লাগতো৷ কিন্তু অনীশ ওর বাইকটা সার্ভিসিং করাতে গেছিল৷ফেরেনি এখনও৷
পিউ কে বাজার যাওয়ার পথে ড্রয়িং ক্লাস এ ছেড়ে দিয়ে এসেছে৷ আজ একটু দেরিতে আনতে যেতে বলেছেন টিচার৷ আজ ওনার ছেলের বার্থডে পার্টি হবে৷ আর তাতে স্টুডেন্টস্ দেরও ইনভাইট করেছেন৷ হাতব্যাগ থেকে চাবির গোছাটা বার করে সদর দরজার চাবিটা বের করল নীনা৷ ভেতরে ঢুকে বাড়ির মেন দরজার তালাটা খুলেই “মা গো!!” করে চিৎকার করে উঠল নীনা৷ একটা কালো বেড়াল পায়ের পাশ দিয়ে হুড়মুড়িয়ে বেড়িয়ে গেল৷ “বিচ্ছিরি” বলে চেঁচিয়ে উঠল নীনা৷ বুকের ভেতর যেন হাপর টানছে৷ঘরে ঢুকে ঢকঢক করে এক-গ্লাস জল খেয়ে সোফায় শরীরটা ছেড়ে দিল৷ কালো বেড়ালটা ছুটে গিয়ে পাঁচিলে ওঠার পর একবার পিছন ফিরে নীনার দিকে তাকিয়েছিল৷ সে দৃষ্টিতে এমনকিছু ছিল যাতে নীনার সর্বাঙ্গ শিহরিত হয়ে উঠেছিল৷ নীনা ভাবল বেড়ালটা কিছু অনিষ্ট করে রেখেছে কি না দেখা দরকার কিন্তু সেই মুহূর্তে নীনার শরীর ও মন সায় দিচ্ছিল না উঠতে৷ তাই নীনা নিশ্চল হয়ে এলিয়ে রইল সোফায়৷ ঐভাবে এলিয়ে বসে থাকতে থাকতে বুঝি চোখ লেগে এসেছিল নীনার৷যখন চোখ খুলল তখন সন্ধ্যা নেমেছে বাইরে৷ ঘরের ভিতর আলো জ্বালা হয়নি নীনার৷ আলো জ্বালাবার উদ্দেশ্যে উঠে দাঁড়ালো এবার৷নতূন বাড়িতে অভ্যস্ত হয়নি এখনও৷ অন্ধকারে হাল্কা ঠাহর করে যেতে যেতে নীনা ‘উফ্’ করে একটা হোঁচট খেলো৷ঠিক অনেকটা একটা মানুষ পড়ে রয়েছে মনে হল ওর৷ভয়ে বিহ্বল হয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়েছিল নীনা৷ কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল তা ওর চিন্তাশক্তির অতীত৷ হঠাৎ অনীশের বাইকের আওয়াজে নীনার সম্বিৎ ফিরল৷
কাঁপা কাঁপা শরীরে বাইরে বেরোল ও৷ অনীশ বোধহয় অনেকক্ষণ ধরেই বাইরে দাঁড়িয়ে আছে৷ সদর দরজা খুলতেই বিরক্তি জড়ানো গলায় বলল “কি গো বাইরের জামাকাপড় পড়ে ঘুমিয়ে গেছিলে নাকি?! কতক্ষণ ধরে ডাকছি আর হর্ন বাজাচ্ছি৷”
নীনা বলতে চাইছিল যে সে তো যখনই আওয়াজ পেয়েছে তখনই খুলতে এসেছে৷কিন্তু কথাটা বলার জন্য শক্তি ও জড়ো করে উঠতে পারছিল না৷ বড্ড ক্লান্ত লাগছিল ওর৷ অনীশ বাড়ির মধ্যে ঢুকে সব আলো জ্বালিয়ে দিল৷ “আলোগুলোও জ্বালাওনি৷” নীনার কানে কথাগুলো ঢুকছিল না৷ ও কিসে হোঁচট খেলো সেটা তন্ন তন্ন করে খুঁজে চলেছিল৷ খাটের তলা, আলমারির কোণ, ফ্রিজের পাশ, বারান্দা সব খুঁজে ফেলল, বলা ভাল গোটা বাড়ি একরকম চিরুনি তল্লাসি করেও নীনা কিচ্ছু খুঁজে পেল না৷ অনীশ পিউ কে আনতে গেল গাড়ি নিয়ে৷
দশ মিনিটের হাঁটা পথ সুতরাং খুব তাড়াতাড়িই ফিরে পড়বে অনীশ পিউ কে নিয়ে৷ হঠাৎ নীনার মাথার মধ্যে একটা চিন্তা বিদ্যুতের মত ঝিলিক দিয়ে উঠল৷নীনার খুব ভাল করেই মনে আছে ও সবকটা জানলা খুব ভাল করেই বন্ধ করেই বেড়িয়েছিল৷ তাহলে বেড়ালটা ঢুকলো কোথা দিয়ে?! ওপরতলার বারান্দা দিয়ে..? নীনা দুদ্দাড়িয়ে ছুটে গেল ওপরে৷কিন্তু ওপরে উঠতে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল৷ সিঁড়ির মুখের আলো আঁধারিতে ও কে দাঁড়িয়ে?! নীনা চলচ্ছক্তিরহিত হয়ে অবিচল নিজের জায়গায়৷ ছায়ামূর্তি ক্রমশ এক পা এক পা করে নেমে আসছে সিঁড়ি দিয়ে৷ ছায়ামূর্তির শরীর থেকে ভেসে আসছে একটা চাপা গোঙানির শব্দ৷ ক্রমশ নীনার দিকে এগিয়ে আসছে ছায়ামূর্তি৷ আলো আঁধারি ক্রমে ক্রমে চোখ সওয়া হয়ে আসছে নীনার৷ ছায়ামূর্তি ক্রমশ আরোও এগিয়ে আসছে৷ এ কে???!! আরেহ্হ এ তো সেই পাগলি বুড়িটা!!!! এ এখানে কি করে এলো??!নীনাকে দেখে বিচ্ছিরিভাবে খিঁকখিঁক করে হাসতে লাগলো বুড়িটা৷” ভয় পেয়েছিস??!! হি হি হি..” বুড়ির খয়াটে চোখের তারা ক্রমশ আরও উজ্জ্বল হচ্ছে আর চোখের তারাটা ক্রমশ চেরা হয়ে গিয়ে চাহনি কালো বেড়ালটার মত হিংস্র হয়ে যাচ্ছে৷ এগিয়ে আসছে৷কাছে আরও ..কাছে৷.. নীনা চোখ বন্ধ করে ফেলেছে আর…তারপরই—
“মাম্মি মাম্মি৷” ধড়মড়িয়ে উঠে বসেছে নীনা৷ পিউ আর অনীশ মুখের উপর ঝুঁকে আছে৷ সোফার ওপর আধশোয়া ভাবে বসে নীনা তাহলে এতক্ষণ একটা দুঃস্বপ্ন দেখছিলো!!?? অনীশ এক গ্লাস জল এগিয়ে দিল৷ নীনা এক চুমুকে সমস্ত জল টা নিঃশেষ করল৷
“ঠিক আছ এখন?,” অনীশ পাশে বসেছে নীনার৷
পকেট থেকে রুমালটা বার করল৷ ঘেমে চান করে গেছে নীনা৷ বিধ্বস্ত একটা ভাব চোখেমুখে৷
“নীনা কাল রাতে তোমার ভাল ঘুম হয়নি তাই খুব টায়ার্ড হয়ে পড়েছো আর তোমার অবস্থা দেখে তো বুঝতেই পারছি উল্টোপাল্টা কোন স্বপ্ন দেখে ভয় পেয়েছো৷ তুমি আজ একটু রেস্ট নাও৷ আমি বাজার থেকে একটু রুটি তর্কা আনার ব্যবস্থা করি গিয়ে৷”
নীনা আর কিছু দ্বিরুক্তি করল না৷ সত্যিই বড্ড ক্লান্ত লাগছে ওর৷ আর সাথে সাথে মনটাও শিথিল৷ পিউ এসে বসেছে পাশে৷ ড্রয়িং ক্লাস এর ঘটনার অনর্গল বিবরণ দিচ্ছে৷খুব আনন্দ হয়েছে আজকে ওর৷ সে সবই মাম্মামের সাথে শেয়ার করছে ও৷ কিন্তু সব নীনার কানের পাশ দিয়ে বেড়িয়ে যাচ্ছে৷কথাগুলোতে মন দিচ্ছে না ও৷হঠাৎই পিউ আঁকার খাতাটা নিয়ে এল “দেখ, মাম্মি আজ কি draw করেছি!!” নীনার সামনে খাতাটা রেখে খাতার পাতা ওল্টালো ও৷ অপটু হাতে এ কি এঁকেছে পিউ??!! এ তো এ তো সেই কালো বেড়ালটার ছবি!!!!সেইরকম পিছন ফিরে তাকিয়ে আছে..আর হলুদ কালো প্যাস্টেলে চোখগুলোতে অবিকল সেই নিষ্ঠুরতা ফুটে উঠেছে৷ নীনা চিৎকার করে উঠল” এটা কি এঁকেছো?” আচমকা এমন অনভিপ্রেত বকুনিতে পিউ কেঁদে ফেলল৷ নীনা ঝুঝতে পেরেছিল ও বড্ড বেশী জোরে চিৎকার করে উঠেছে৷ নিজেকে খানিকটা সামলে নিয়ে পিউকে বলল” এটা কি এঁকেছো মা?কে আঁকতে বলেছে?” “স্যর সামনে যা দেখতে পাচ্ছি সেগুলো আঁকতে বলল আমার পাশের জানলার কাছে স্যরদের পাঁচিলের ওপর এই ম্যাওটা বসেছিল আর তাই আমি ঐটা ড্র করলাম তো৷”
“কেন তুমি আর কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছিলে না??!!”
“পাচ্ছিলাম তো৷ কিন্তু আমার ম্যাও-পুষি খুব ভালো লাগে তো ..তাই৷” বোকা সরল হাসি হেসে পিউ জবাব দিল৷ নীনা মাথাটা চেপে ধরল৷ ও র শুধু ও মনে হচ্ছিল ও যেন কোন গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়েছে যেখান থেকে বেরোনোর কোন রাস্তা নেই৷ নীনার ভাবনায় ছেদ পড়ল৷ অনীশ ঘরে ঢুকল খাবারের প্যাকেট হাতে৷
“রুটি আর তড়কা আনতে গিয়ে আরও
কি সব এনেছো?এত কিসব কি?”
“দোকানে গিয়ে একজন চিকেন টিক্কা নিচ্ছে৷আমি ভাবলাম আমার মাদামেরও তো এটা কি যেন বল “ওহ্ ফ্যাভ লাগে” তাই নিয়ে এলাম৷আর আমার পিউসোনার জন্য এটা কি দেখতো?”
“আইস ক্রিম!!!”
খুশিতে ডগমগ পিউ ছুটে গিয়ে আইস ক্রিম টা নিয়ে নিল৷
“চল না নীনা তাড়াতাড়ি খেয়ে নিই৷কাল থেকে আমার আবার অফিস৷তুমিও টায়ার্ড৷ একেবারে খেয়ে শুয়ে পড়া যাক৷ অনেকটা রেস্ট হবে তোমার৷ কি বল?”
“হ্যাঁ তাই তো”..খাবারের প্যাকেটগুলো নিয়ে যেতে যেতে নীনা বলল “আমি কটা আমার কাজ সেরে একেবারে খাবারগুলো সার্ভ করে নিয়ে চলে আসছি৷ পিউ আজ এটা ওটা খেয়ে এসেছে৷ তার ওপর আইসক্রিম খাচ্ছে৷ ও আর কিছু খাবে না৷ রাতে দুধ খাইয়ে দেব খিদে পেলে৷”
নীনা রান্নাঘরে কাজ করতে করতে আনমনা হয়ে গেল৷অনীশকে খুলে বলতে ইচ্ছা করছে সবকিছু৷ কিন্তু কোথায় একটা বাধছে৷ ফিজিক্সে সান্মানিক নিয়ে পড়াশোনা করা অনীশ ভীষণরকম যুক্তিবাদী, বাস্তববাদী এবং সাহসী৷ দোষের মধ্যে সে একজন কট্টর নাস্তিক, এই যা৷ নীনাও ছোট থেকে ডাকাবুকো ধরনের৷ মনে পড়ে দেখাশোনার দিনে অনীশ ওদের বাড়ির পেছনের বাগানটায় ঘুরতে ঘুরতে জিজ্ঞেস করেছিল, ”ভুতে ভয় পান?”
“নাঃ, মানুষকে ভয় পাই৷”
“এইরে আমাকে আপনার ভয় করছে নাকি?”
“নাঃ৷ আপনার মত পজিটিভ, হাসিখুশি মানুষকে ভয় পেতে নেই, বিশ্বাস করতে হয়৷” মিষ্টি হেসে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিল নীনা৷কথাটা শুনে হাল্কা হেসেছিল অনীশ৷ বিয়েটা সেদিনই পাকা হয়ে গেছিল ওদের৷
সেদিনের সেই মেয়েটা নাকি আজ কটা তুচ্ছ ঘটনা জোড়া লাগিয়ে অলৌকিকত্বের তকমা সাঁটাবে আর পুরানোপন্থী বিশাখা নাকি বলে উঠবে, ”দেখলে তো বৌমা৷বলেছিলাম না..” ইত্যাদি ইত্যাদি৷না না এ কিছুতেই হতে দেবেনা ও৷ মাথার ভেতরের চিন্তাগুলো দূরে ঠেলে দিয়ে ও কাবাবের প্রতি মনোনিবেশের চেষ্টা করল৷ হাতের কাজগুলো মোটামুটি গোছানো হয়ে গেছে৷ খাবারটা মাইক্রো ওয়েভে দিয়ে রুটি, তড়কা, রায়তা, চাটনি আর স্যালাডগুলো প্লেটে নিয়ে নিল নীনা৷ হঠাৎ কাপ্তান এর পকেটে রাখা মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল৷ফোনটা বের করে দেখল৷ মা করেছে৷
“হ্যাঁ মা বলো৷”
“কি করছিস রে?”
“এই মা জাস্ট খেতে বসবো৷ কেন গো?”
মা আর বাবা কিছু একটা গুজগুজ করছে৷বাবা কিছু একটা বলতে গেলো৷মা ধমক দিয়ে থামালো বাবাকে৷
“কি বলছো বলতো তোমরা?,” অধৈর্য হল নীনা৷
“সোনা মা তোমরা খেয়ে দেয়ে উঠে ফোন করো কেমন?”
“সেই ভালো৷”
নীনা আর অনীশ একটা পছন্দের সিনেমা চালিয়ে দিয়ে আরাম করে খেলো৷
ওদিকে পিউ পুতুল নিয়ে খেলতে খেলতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে কেউ খেয়াল করেনি৷ মুভির বাকি অংশ পরে দেখা হবে এই ডিসাইড করে ওরা শোওয়ার প্রস্তুতি নিতে গেল৷ পিউ এর বিছানা করে নিল নীনা৷ অনীশ পিউকে তুলে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিল৷আয়নার সামনে বসে নাইট ক্রিম লাগাতে লাগাতে ওর খেয়াল পড়ল, “এই রে মা কে একটা ফোন করতে হবেতো৷”
ফোন করতেই ওদিকে নীনার মা প্রতিভার উতলা ভাব দেখে অবাক হল নীনা—
“সোনা মা এতক্ষণ বাদে ফোন ধরলি, মানে তোরা কি দেখলি খবরটা?”
“না, না, আমরা খবর টবর দেখি নি৷ যা বলার পরিষ্কার করে বলো, আমি তো ছাতার মাথা কিছুই বুঝতে পারছি না৷”
“দেখ ‘খবর এখন’ চ্যানেলে দেখ এই খানিক আগে এক ভদ্রমহিলার বারান্দা থেকে পড়ে রহস্যজনকভাবে মারা গেছে৷ বর্ধমান জেলায়, ঐ রাণীসায়র এর কাছাকাছিই জায়গাটা, তোদের কাছাকাছি নাকি, চেনাশোনা কেউ নাকি তাই জানছিলাম আর কি৷”
“আচ্ছা রাখো, দেখছি৷”
নীনা এসে ঝটিতি টিভি অন করল৷ খবরের চ্যানেল খুললো৷
“আমরা এখন একদম দুর্ঘটনাটি যেখানে ঘটেছে তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছি৷ এই যে আমার পিছনে যে সবুজ বহুতলটি দেখছেন তারই চারতলা থেকে ঐ মধ্যবয়সি ভদ্রমহিলা নীচে পড়ে যান৷ এবং তৎক্ষণাৎ তাঁর মৃত্যু হয়৷ এখন এটি আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত খুন সে ব্যাপারে তদন্ত করবে পুলিস…” নতুন এসছে নীনা এখানে৷ তবুও চেনা চেনা ঠেকছে বাড়িটা৷ ওর হঠাৎ কি মনে হল, দুদ্দাড়িয়ে ছুটে গেল ওপরের বারান্দায়৷ দূরের সবুজ বহুতলের সামনেটা ভিড়ে ঠাসা৷ অনেকগুলো গাড়ি দাঁড়িয়ে আর হাল্কা চেঁচামেচির আওয়াজ৷আরে এ তো ওই দূরের রাস্তার বাঁকের সবুজ বহুতলটা..চারতলা..সংবাদ চ্যানেলের ছবিটা!!! আরেহ্ ইনি তো বিকেলে দেখা হওয়া সেই মহিলা!!!এ কি করে সম্ভব??!! বিকেলে দেখা হওয়া বেশ একজন সপ্রতিভ মানুষ কেন করবেন এমন কাজ??!! কি হল এটা??!! মাথা কাজ করছে না নীনার৷ আজই হঠাৎ দেখা হল মহিলার সঙ্গে, আজই তিনি কত কি বললেন আর আরও কত কি বলতে চাইছিলেন, এসব কি স্রেফ একটা কাকতালীয় ঘটনা?! সামনে যে বহুতলটা তৈরি হচ্ছে সেটার দিকে চোখ পড়ল৷ দুটো উজ্জ্বল আগুনের ডেলার মতো কি জ্বলছে ও দুটো??!! শরীরের মধ্যে একটা কাঁপুনি অনুভব করল নীনা৷ চোখদুটো এগিয়ে আসতে আসতে হাল্কা আলো আঁধারিতে নীনা দেখল আস্তে আস্তে কার্নিশে বেড়িয়ে এসেছে সেই কালো বেড়ালটা৷ নিষ্ঠুর স্থির চোখে নীনার দিকে তাকিয়ে আছে আর জিভ দিয়ে মুখ চাটছে৷ নীনার দমবন্ধ লাগছিল ভীষণ৷ হঠাৎ ও কাঁধে একটা চাপ অনুভব করল৷ নীনা যেন কোন ঘোরের মধ্যে ঢুকে গেছে৷ পিছন ফিরে দেখার সাহস বা ইচ্ছা কোনটাই ওর মধ্যে আর অবশিষ্ট ছিল না৷ কাঁধের কাছে একটা
ঝাঁকুনি আর তারপরই অনীশের গলা পেল ও৷
“নীনা তুমি ঠিক আছ?! কি হল তোমার?! হঠাৎ মা কে ফোন করতে করতে টিভি চালিয়ে দিলে আর তারপরই দুমদাম করে ছুটে ওপরে চলে এলে..মানে কি??”
নীনা হঠাৎই ফুঁপিয়ে উঠল, “অনীশ, ঐ কালো বেড়ালটাকে আমি আর ..”
নীনার কথা শেষ হওয়ার আগেই অনীশ বলল, “নীনা তুমি যেদিকে আঙ্গুল দেখিয়ে রয়েছ সেই জায়গায় বা তার ত্রিসীমানাতেও কিন্তু এখন কোন কালো, সাদা বা কোন রঙেরই কোন বেড়াল নেই৷ আর প্লিজ তুমি এখন এটা বলো না এই রাতেরবেলা তুমি এত ছেলেমানুষি শুধুমাত্র একটা বেড়ালের জন্য করছো৷” নীনার আর কিছু বলার ইচ্ছা হচ্ছিল না৷
অনীশের এবার ঐ দূরের জটলাটার দিকে চোখ পড়ল৷ বলল “এখানে আবার কি হল?” নীনা যতটা সম্ভব সাজিয়ে কথাগুলো বলার চেষ্টা করতে লাগলো৷ অনীশ বলল,
“ওহ্ মাই গড৷ বিচ্ছিরি ব্যাপার গো!!ও, তোমার সাথে ঐ মহিলার দেখা হয়েছিল তাই তুমি এতটা আপসেট??!এটা সত্যিই একটা বড়ই দুঃখজনক ঘটনা তবে এটা জাস্ট একটা কোইনসিডেন্স্৷ ইসন্ট ইট নীনা?”
নীনা অবাক চোখে তাকাল অনীশের দিকে৷ মহিলার বলা বাকি কথাগুলোর উপর কোন ফোকাসই করল না অনীশ৷ বিরক্ত হয়ে কথাগুলো পুনরাবৃত্তি করার আগেই, পিউ এর আর্ত চিৎকারে ওরা রীতিমত চমকে উঠল৷ দুদ্দাড়িয়ে ওরা নীচের তলার বেডরুমের দিকে ছুটলো৷গিয়ে দেখল—
পিউয়ের ভয়ার্ত দুটি চোখ ঠিকরে বেড়িয়ে আসছে৷ নীনা গিয়ে দুহাতে কোলে নিয়ে পিউকে জড়াতেই, পিউ অজ্ঞান হয়ে নীনার কোলে ঢলে পড়ল৷ আর ঠিক তখনই পাশের বারান্দার জানলার বাইরে কালো হিংস্র শ্বাপদের মত ও আবার বেড়ালটাকে দেখতে পেল৷
“অনীশ দেখ দেখ সেই বেড়ালটা৷ ও আমার মেয়েকে নিতে এসেছিল অনীশ৷…অনীশ কিছু কর৷”
হাঁউমাঁউ করে কেঁদে উঠল নীনা৷
“স্টপ দ্যাট ননসেন্স নীনা৷ মেয়েটা ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেল আর তুমি সেই বোকা বোকা কথাগুলো!! হোয়াট রাবিশ??!!”
* * *
নীনা চুপচাপ কাঁধ ঝুলিয়ে বসে আছে৷অনীশ পিউকে কোলে নিয়ে খানিক পায়চারি করল তারপর নীনাকে বলল একটু দুধ গরম করে আনতে৷ গরম দুধটা খুব একটা বেশী খাওয়ানো গেল না পিউকে৷ ভোরের দিক থেকে ধুম জ্বর এলো পিউ এর৷ তার সঙ্গে সমানে ভুল বকা৷ “মাম্মি তুমি কেন আমাকে ভয় দেখাচ্ছ?, ” “আমার বড্ড ভয় করছে, ” “মাম্মি মুখের ওপর থেকে চুলগুলো সরাও না, ” “মাম্মি ম্যাওটাকে তাড়িয়ে দাও না, ” “ও আমাকে কাম্মাতে আসছে, ” না আমি কোথাও যাব না, ” “তুমি কেন রোজ আস আমাদের বাড়ি? মাম্মি ড্যাডি কে বলে দোব৷চলে যাও৷” অনীশ অকস্মাৎ দুম করে রেগে যায়, “তোমার এসব উৎপটাং চিন্তাভাবনাগুলো কিভাবে মেয়েটাকে ইনফ্লুয়েন্স করেছে ক্যান ইউ জাস্ট সি?” নীনার চাপা কান্নাটায় একটা দমক আসে কেবল আর কিছু বলতে শোনা যায় না ওকে৷ ক্যালপল সিরাপ আর জলপট্টি দিয়েও জ্বরটাকে কোনমতে বশে আনা যাচ্ছে না পিউয়ের৷ ক্যালপলের প্রভাব কাটতেই পারদ চড়ে যাচ্ছে৷ বেলার দিকে একজন জনৈক ডাক্তারবাবু এলেন৷ সব দেখেশুনে ডাক্তারবাবু বললেন, “ভীষণ ট্রমাটিক হয়ে পড়েছে বাচ্চাটি৷ কি করে হল এমন? ভীষণ সিরিয়াস অবস্থা তো মশাই৷”
অনীশ বলল “আসলে আমরা নতুন এসেছি ডাক্তারবাবু৷ নতুন জায়গা তো৷ তার ওপরে কাল রাতে ঘুমের ঘোরে একটি বেড়াল দেখে এমনটা ঘটেছে হবে৷ তার আগে অবধি মেয়ে একদম ঠিক ছিল ডাক্তারবাবু৷”
– “ও৷ সাবধানে থাকুন৷ যা হল কাল আপনাদের এখানে৷ ভেরি স্যাড আর মিস্টিরিয়াসও বটে! যাইহোক আমি একটা ইনজেকশন করে গেলাম৷ আর এই ওষুধগুলোও লিখে গেলাম৷ আর কিছু টেস্টস কারণ কোনরকম ইনফেকশন এর কারণেও এমনটা হতে পারে৷ হোপ সি উইল গেট ওয়েল সুন৷”
ডাক্তারবাবুকে এগিয়ে দিয়ে এসে ওষুধগুলো আনতে ছুটলো অনীশ৷ নীনা পিউয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বসে আছে চুপচাপ৷ জ্বর কমলেও আধবোজা চোখে শুয়ে আছে পিউ৷
৩
একদিন একরাত কেটে গেছে কিন্তু পিউয়ের অবস্থার নামমাত্রই উন্নতি ঘটেছে৷খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে পিউ৷ যে জেনারেল ফিজিসিয়ানএর কাছে দেখানো হচ্ছিল তিনি ভালো পেডিয়াট্রিসিয়ানের নাম বলে তাঁর ওপিনিয়ন নেওয়ার উপদেশ দিয়েছেন৷এদিকে টেস্টেও কিছু ধরা পড়েনি৷
অনীশের আর ছুটি নেওয়ার উপায় ছিল না৷ এমনিতেই এতদিনে বেশ ছুটি গেছে৷ আজ ওকে বেড়োতেই হয়েছে৷ তবে যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি আসার চেষ্টা করবে বলে গেছে আর খুব সিরিয়াস কিছু মনে হলে অবশ্যই যেন ফোন করে৷
সেই বিচ্ছিরি গন্ধটা আবার পাচ্ছে নীনা৷ অনেকটা হসপিটালের পুরানো নোংরা তুলো ব্যান্ডেজের স্তূপের থেকে যেরকম গন্ধ পাওয়া যায় সেইরকম৷ এই গন্ধটাই ও পেয়েছিল যেদিন কালোবেড়ালটাকে কার্নিশে দেখেছিল ও৷ খুব করে রুম ফ্রেশনার দিয়েছিল তাই৷ সেদিন রাতেই ঐ বিচ্ছিরি দুর্ঘটনাটা ঘটল তাহলে আজও কি কোন?? আবার শরীরে একটা শিরশিরানির অনুভব হল নীনার৷ এ কদিন উত্তেজনায় নীনার হাঁপানির ভাবটা এত বেড়েছে যে ঘন ঘন ইনহেলার ব্যবহার করতে হচ্ছে৷ ইনহেলারটা হাতড়াচ্ছিল ও৷ হঠাতই হাতের কাছে কে যেন এগিয়ে দিল ইনহেলারটা৷ ক্লান্ত চোখে তাকালো নীনা৷
বিশাখা এসে দাঁড়িয়েছে ওর পাশে৷
নীনা আবেগের বশে “মা গো” বলে চেঁচিয়ে উঠে বিশাখাকে জড়িয়ে ধরল৷ অঝোরে কেঁদেই চলল কিছুক্ষন৷
“চুপ কর বৌমা৷ কেঁদোনা মা৷ সব ঠিক হয়ে যাবে৷”
কান্নার রোখ থামলে নীনা একটু হাল্কা অনুভব করল৷ বলল,
“হঠাৎ চলে এলেন যে মা?”
“মনের টান বৌমা৷ কদিন এত পিউ দিদিভাইয়ের কথা মনে পড়ছিল যে আর থাকতে পারলাম না৷”
আর এসে দেখি তোমার এই অবস্থা আর পিউদিদিকেও তো দেখেই বোঝা যাচ্ছে খুব অসুস্থ৷
দাঁড়াও আমি জামাকাপড় ছেড়ে হাত পা ধুয়ে একটু খাবার ব্যবস্থা করি৷”
দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরে বড্ড ঘুম পেল নীনার৷ কদিনের টানাপোড়েন আর রাতজাগায় বড্ড ক্লান্ত ও৷ এদিকে পিউ ও খানিক সুস্থ হয়েছে৷ একটু ঝোলমাখা ভাতও খেয়েছে৷ মনটাতেও তাই একটু স্বস্তি৷ অনীশ ফোন করেছিল৷ মা এসেছে শুনে বেশ আশ্বস্ত হয়েছে আর আরও একটু কাজ সেরে দেরিতেই ফিরবে জানিয়ে দিয়েছে৷
“বৌমা বড্ড ঝামড়ে গেছে তোমার মুখচোখ৷ একটু ঘুমিয়ে নাও৷ আমি এই দিদিভাইয়ের সাথে রয়েছি৷তুমি নিশ্চিন্ত থাকো৷”
বালিশ পাতছিলো নীনা৷ হঠাতই বিশাখা বললেন,
“তোমরা বোধহয় বাড়িটার ঠিকঠাক খোঁজ নাওনি বৌমা৷ রাস্তায় আসার পথে রিক্সায় এক অনেক বয়স্ক মহিলার কাছে যা শুনলাম—”
ঠোঁট কামড়ালেন বিশাখা৷
“কি শুনলেন মা? বলুন না৷”
“এই বাড়ি যার, সেই রাধামাধব রায় নাকি ছিলেন অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি৷ কিন্তু তাঁর স্ত্রী রমলা ছিলেন অত্যন্ত কুটিল এবং দজ্জাল চরিত্রের৷ বিয়ের অনেকদিন পরেও তাদের কোন সন্তান হয় নি৷ এদিকে রমলা কোন এক দুরাচারী তান্ত্রিকের পাল্লায় পড়ে তন্ত্র সাধনায় মেতে ওঠে৷ পিশাচ এবং পিশাচিনী তৈরির খেলায় মেতে ওঠেন রমলা৷ মানুষের ক্ষতিসাধনের মাধ্যমেই সে সুখ খুঁজে পেতে থাকে৷ রাধামাধব বাবু তাঁর অত্যাচারে বাড়ি ছেড়ে চলে যান৷তাঁর আর খোঁজ পাওয়া যায় না৷ রমলা একাই এ বাড়িতে মেতে থাকেন নিজের নারকীয় পিশাচ চর্চা নিয়ে৷ তাঁর সঙ্গী বলতে ছিল একখানি কালো বেড়াল আর এই বাড়ির ঐ পাশে থাকা এক বিধবা বুড়ি, সে নাকি এখন পাগল হয়ে গেছে৷ এদিকে বছর তিনেক আগে রমলা মারা যান আর কোন এক বেনামী বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাড়িটি একটি পরিবার কেনে৷ সেই পরিবারের স্বামী, স্ত্রী ও বছর তিনেকের ফুটফুটে সন্তানটির রহস্যজনক মৃত্যু হয়৷ এই ঘটনার কিছু অংশ ঐ তোমাদের ওদিকের সবুজ বাড়ির চারতলার বউটি শুনেছিল তার শ্বশুরমশাইয়ের কাছ থেকে, উনি রাধামাধবের বন্ধু ছিলেন৷ আর তারও এমন অকালমৃত্যু ঘটে গেল৷”
গল্প শুনতে শুনতে নীনা কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল৷ মরণ ঘুমে ধরেছিল বোধহয় ওকে৷
নীনা যখন উঠল তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে৷ অন্ধকারে কিছু ঠাহর হচ্ছিল না ওর৷মাথাটাও ঘোর৷আস্তে আস্তে বিশাখার কথাগুলো মনে পড়তে লাগলো ওর৷
ও আশা করেছিলো বিশাখা পাশেই থাকবে৷ ও চেঁচিয়ে বলল,” এত ডিটেইল্স কি করে জানল ঐ মহিলা?! মা?”
হঠাৎ করেই কোথা থেকে যেন ঘরে হাল্কা আলো এল আর ও দেখল বিশাখার সোফায় বসা রূপটা ক্রমশ পরিবর্তিত হচ্ছে৷ মাথায় খোলা চুল জট পাকানো৷মাথায় বড় লাল টিপ৷লাল কাপড়৷বড় বড় ময়লা নখ আর সবথেকে বিশেষ দুটি চোখ আর দুই চোখের বড় বড় খয়াটে তারার মধ্যে দুটো কালো বিন্দু মুখটাকে ক্রূর এবং পৈশাচিক করে তুলেছে৷
কোলের ওপরে বসে আছে কালো বেড়ালটা৷স্থির চেরা চোখে তাকিয়ে আছে নীনার দিকে৷
* * *
ওদিকে অনীশের কাছে ফোন এল৷ বিশাখার কল৷
“মা কি হলো? ড্রাইভ করছি৷ এই জাস্ট এসে গেছি৷ পনেরো মিনিটে ঢুকে যাব৷ কোন সমস্যা হয়নি তো?”
“ও মা সমস্যা কি! কতদিন পড়ে আসছিস! তা হ্যাঁ রে, বউমা আর পিউদিদিও আসছে তো?”
অনীশের গাড়ি ব্রেক ফেল করল৷ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অনীশের গাড়ি দুবার পাল্টি খেল৷
* * *
বছর তিনেক বাদে খবর কাগজে ‘ক্রয় বিক্রয় ‘তে একটা বিজ্ঞাপন বেরোলো
“বর্ধমানে রাণীসায়র সংলগ্ন এলাকায় দু কাঠা জমির ওপরে একটি দুতলা বাড়ি অত্যন্ত সুলভে পাবেন৷ অত্যাবশ্যকীয় কারণে শীঘ্র বিক্রয় করতে ইচ্ছুক৷ সত্ত্বর যোগাযোগ করুন৷”
বিজ্ঞাপনদাতা: শ্রী অনীশ সেন